রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন সম্প্রসারণে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আটশ পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার একটি অংশ ব্যবহার করা হবে নারীদের জন্য নির্ধারিত জনপ্রিয় গোলাপি বাস সেবায়। এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ।
দুটি পৃথক প্রকল্পের আওতায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একতলা বৈদ্যুতিক বাস কেনা হবে। এর একটি অংশ যুক্ত হবে নারী যাত্রীদের জন্য চালু হওয়া বিশেষ বাস সেবায়, ফলে এই সেবার রুট, বাসের সংখ্যা ও কার্যপরিধি সবই বাড়বে। বাকি বাসগুলো ব্যবহার করবে দেশের সরকারি পরিবহন সংস্থা, সাধারণ যাত্রীসেবায়।
ঋণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং সরকারি পরিবহন সংস্থার একাধিক সূত্র অনুযায়ী, দুটি প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। এর একটি অংশ মেটানো হবে সরকারি কোষাগার থেকে, বাকিটা বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে।
সংস্থাটির প্রশাসন ও পরিচালন বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে মোট এক হাজার বাস কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নারীদের জন্য চালু থাকা গোলাপি বাস সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি জানান। তবে চীন থেকে পাঁচশ ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তিনশ বাস কেনার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।
উল্লেখ্য, নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় সম্প্রতি গোলাপি রঙের বিশেষ মহিলা বাস সেবা চালু হয়েছে। বর্তমানে চলাচলরত এসব বাসের বেশিরভাগই দোতলা এবং এতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় তিনশ একতলা বৈদ্যুতিক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস কেনা হবে, যার মোট প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় দুই হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এর সিংহভাগ আসবে বৈদেশিক ঋণ থেকে, বাকি অংশ সরকারি তহবিল থেকে মেটানো হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে চলতি সময় থেকে ২০৩০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুমোদন করেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাস কেনার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়ে এই প্রস্তাবে ইতিমধ্যে সই করেছেন। ঋণের উৎস হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলকে বেছে নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন উপসচিব জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তিনশ বাস কেনার পরিকল্পনা নিয়ে ঋণ পেতে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকে ২০২৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো আন্তঃনগর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য ও আরামদায়ক করা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থায় প্রবেশ করা, পুরোনো বাসের পরিবর্তে নতুন বাস সংযোজন, নগরের যানজট ও পরিবেশ দূষণ কমানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
ব্যয়ের খাতভিত্তিক বিবরণে দেখা যায়, বাস কেনার জন্যই বরাদ্দ থাকছে সবচেয়ে বড় অংশ। এ ছাড়া যন্ত্রাংশ সংরক্ষণ, চার্জিং স্টেশন নির্মাণ, জেনারেটর ও ট্রান্সফরমার সংগ্রহ, বাস রাখার শেড, গুদামঘর, ওয়ার্কশপ, ওয়াশিং প্ল্যান্ট, নজরদারি প্রযুক্তি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, উদ্ধারকারী যান এবং দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্যও পৃথকভাবে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে চীন থেকে পাঁচশ একতলা বৈদ্যুতিক বাস কেনার একটি পৃথক প্রস্তাবও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় এক হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নের বাইরে বড় অংশই আসার কথা চীনের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণ হিসেবে।
তবে এই প্রকল্পের প্রস্তাবে এখনো সই করেননি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী। বাসের সার্ভিস-আয়ু, ঋণের সুদহার এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহ ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো আরও যাচাই করার জন্য প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবে ইতিমধ্যে অনুমোদন মিললেও চীনের প্রস্তাবটি নিয়ে এখনো পর্যালোচনা চলছে।
চীনা বাস কেনার পেছনে মূল লক্ষ্য হলো ডিজেলচালিত বাসের পরিবর্তে শূন্য কার্বন নিঃসরণকারী বৈদ্যুতিক বাস প্রবর্তনের মাধ্যমে বায়ুদূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো, যাত্রীদের জন্য আধুনিক ও আরামদায়ক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমিয়ে আনা। পাশাপাশি এটি দেশের জলবায়ু-সংক্রান্ত জাতীয় প্রতিশ্রুতি এবং খসড়া বৈদ্যুতিক বাসনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নেও সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের আওতায় বাস কেনার পাশাপাশি স্পেয়ার পার্টস সংগ্রহ, দ্রুতগতির চার্জিং স্টেশন স্থাপন, কম্পিউটারভিত্তিক রোগনির্ণয় ব্যবস্থাসহ আধুনিক ওয়ার্কশপ তৈরি, বহনযোগ্য চার্জার সংগ্রহ এবং চালক-টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণের জন্যও পৃথক বাজেট রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ একদিকে যেমন দেশের গণপরিবহন খাতকে পরিবেশবান্ধব করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, তেমনি নারীদের নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিশ্চিতেও এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দুটি ভিন্ন উৎস থেকে বাস কেনার প্রক্রিয়ায় সুদহার, বাসের স্থায়িত্ব, যন্ত্রাংশ সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ খরচের মতো বিষয়গুলো সতর্কভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিশাল অঙ্কের এই বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও কার্যকর পরিকল্পনা বজায় রাখা গেলে তা দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

