দেশের বড় শিল্পকারখানাগুলো জাতীয় গ্রিডের পরিবর্তে সরাসরি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে খরচ কমানোর যে সুযোগের দিকে তাকিয়ে আছে, প্রস্তাবিত নতুন চার্জ চালু হলে সেই সুবিধা অনেকটাই কমে যেতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য একাধিক চার্জের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ের বিদ্যুৎ ক্ষতির খরচও।
২০২৫ সালের বণিক বিদ্যুৎ নীতির আওতায় বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে আগ্রহী রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো, প্রচলিত বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা এড়িয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করতে পারে।
তবে এই ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য জাতীয় সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহার করতে হবে। সেই অবকাঠামোর খরচ আদায়ের জন্য চার ধরনের উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার চার্জের প্রস্তাব এসেছে।
প্রস্তাবগুলো করেছে বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এসব প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করবে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরাসরি বিদ্যুৎ কিনলেও সেই বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হবে। এই ব্যবহারের জন্য চার ধরনের চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এগুলো হলো সংযোগ প্রবেশ চার্জ, সঞ্চালন পরিবহন চার্জ, গ্রহণ চার্জ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণ চার্জ।
তবে প্রতিটি লেনদেনে সব চার্জ প্রযোজ্য হবে না। বিদ্যুৎ কোন নেটওয়ার্ক ও কত ভোল্টেজের মাধ্যমে যাবে, তার ওপর নির্ভর করবে কোন কোন চার্জ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ৪০০, ২৩০ ও ১৩২ কিলোভোল্ট থেকে শুরু করে ০.৪ কিলোভোল্ট পর্যন্ত ১৩ ধরনের সম্ভাব্য সংযোগব্যবস্থা চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হতে পারে গ্রহণ চার্জ। যে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা শেষ পর্যন্ত শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবে, তাকে এই চার্জ দিতে হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি ইউনিটে এর পরিমাণ হতে পারে ১ টাকা ১৪ পয়সা থেকে ২ টাকা ৯০ পয়সা।
এই চার্জের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক পরিচালনার ব্যয় এবং ভর্তুকি সমন্বয়জনিত অতিরিক্ত অর্থ।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর যুক্তি হলো, বর্তমানে শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়া গ্রাহকদের সরবরাহের খরচের একটি অংশ বহন করা হয়। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত ব্যবস্থা ছেড়ে সরাসরি বেসরকারি বিদ্যুৎ কিনলে বিতরণ সংস্থাগুলোর আয় কমতে পারে, কিন্তু নেটওয়ার্ক পরিচালনার ব্যয় একই থেকে যাবে। তাই এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, একটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ এক বিতরণ সংস্থার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অন্য বিতরণ সংস্থার গ্রাহকের কাছে গেলে সংযোগ প্রবেশ চার্জ দিতে হবে।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি প্রতি ইউনিটে এই চার্জ ৯৭ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫৮ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। ব্যবহৃত ভোল্টেজের মাত্রার ওপর নির্ভর করে প্রকৃত হার নির্ধারিত হবে।
জাতীয় সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে দিতে হবে সঞ্চালন পরিবহন চার্জ। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ ২৩০ কিলোভোল্ট পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ০.৪৬৫৭ টাকা, ১৩২ কিলোভোল্টে ০.৪৯০১ টাকা এবং ৩৩ কিলোভোল্টে ০.৭৮৯১ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।
বর্তমানে সাধারণ গ্রিড সংযোগের ক্ষেত্রে এই চার্জ প্রতি ইউনিটে ০.৩৭ থেকে ০.৩৮ টাকা।এ ছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড প্রতি ইউনিটে ০.০৫ টাকা জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণ চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে।
প্রস্তাবিত চার্জের প্রভাব বোঝার জন্য বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বর্তমান চুক্তিমূল্য বিবেচনা করা যেতে পারে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সম্প্রতি ১১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে। এসব প্রকল্পের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৮১৮ মেগাওয়াট এবং প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের চুক্তিমূল্য ৭.৪৯ থেকে ৮.৩২ মার্কিন সেন্ট।
চুক্তিগুলোর গড় মূল্য প্রায় ৮ মার্কিন সেন্ট, যা প্রতি মার্কিন ডলারের দাম ১২২ টাকা ধরে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৯.৮ টাকা।
অবশ্য এই তুলনা পুরোপুরি সরাসরি করা যায় না। কারণ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অনেক প্রকল্পে সরকারি জমি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিজেদের জমি কিনতে হলে ব্যয় বেশি হতে পারে।
তবু হিসাবটি প্রস্তাবিত চার্জের গুরুত্ব বোঝায়। কোনো শিল্পকারখানা যদি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৯ থেকে ১০ টাকায় বিদ্যুৎ কেনে, এরপর নতুন চার্জ হিসেবে আরও ২ থেকে ৪ টাকা বা তার বেশি যোগ হয়, তাহলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার তুলনায় সরাসরি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেনার সাশ্রয় অনেকটাই কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে গ্রহণ চার্জ যদি প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ ২ টাকা ৯০ পয়সার কাছাকাছি হয়, তাহলে মোট খরচ আরও বেড়ে যাবে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত শর্ত পূরণ করতে অনেক প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত চার্জের কারণে সেই বিদ্যুৎ যদি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয়বহুল হয়ে যায়, তাহলে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার আগ্রহ কমতে পারে।শুধু চার্জই নয়, বিদ্যুৎ পরিবহনের সময় যে পরিমাণ শক্তি নষ্ট হয়, সেটিও গ্রাহকের প্রকৃত ব্যয় বাড়াবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাঠানো পুরো পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রাহকের হিসাবে জমা হবে না। ১৩২ কিলোভোল্ট সঞ্চালন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্ধারিত সঞ্চালন ক্ষতির হার বাদ দেওয়া হবে। এরপর বিদ্যুৎ ৩৩ বা ১১ কিলোভোল্টের বিতরণ নেটওয়ার্ক দিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ ক্ষতিও বাদ দেওয়া হবে।
একাধিক বিতরণ সংস্থার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হলে প্রতিটি সংস্থার প্রযোজ্য বিতরণ ক্ষতি হিসাব করা হতে পারে। তবে একই সংস্থা সঞ্চালন নেটওয়ার্কের দুই প্রান্তে থাকলে বিতরণ ক্ষতি একবারই বিবেচনা করা হবে।
ফলে কোনো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রিডে পাঠাবে, গ্রাহকের হিসাবে কার্যকরভাবে তার চেয়ে কম বিদ্যুৎ জমা হতে পারে। এতে নির্ধারিত চার্জের পাশাপাশি আরেকটি পরোক্ষ ব্যয় যুক্ত হবে।
জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউটের জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, নতুন বাজারটি বিকশিত করতে শুরুতে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার চার্জ যতটা সম্ভব কম রাখা জরুরি।
তার মতে, চার্জ বেশি হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর কাছ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার আর্থিক প্রণোদনা অনেকটাই কমে যাবে।
বিদ্যুৎ খাতের অন্য জায়গার অদক্ষতার খরচ কেন বেসরকারি বিদ্যুতের গ্রাহকদের বহন করতে হবে, সেটিও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির চেয়ারম্যান মোস্তফা আল মাহমুদ আরও সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত চার্জ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ আকর্ষণের সরকারি লক্ষ্যকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তার মতে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে প্রথমেই জাতীয় গ্রিডের কার্যকর দামের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ দিতে হবে। এর ওপর প্রতি ইউনিটে আরও কয়েক টাকা চার্জ যুক্ত হলে সেই দামের সুবিধা প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, চার্জ প্রতি ইউনিটে ২ বা ৩ টাকা হলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ খুব সীমিত হয়ে যাবে।
তার প্রস্তাব, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে শুরুতে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার ব্যবস্থা বিনা মূল্যে চালু করা উচিত। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি আমদানির সীমাবদ্ধতা এবং জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরনের উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত বিবেচনা করে চূড়ান্ত হার নির্ধারণ করবে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি শুধু বিদ্যুতের দামের ওপর নয়, দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ বিনিয়োগের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। চার্জ সহনীয় পর্যায়ে রাখা গেলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি বেসরকারি বিদ্যুৎ কেনা আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। বিপরীতে, অতিরিক্ত চার্জ আরোপ হলে যে দামের সুবিধাকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিই অনেকটা হারিয়ে যেতে পারে।

