দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবাহে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে উঠলেও তা টানা পঞ্চম মাসের মতো ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক ঋণের চাহিদা এখনো শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা তখন পর্যন্ত রেকর্ড সর্বনিম্ন। জুলাইয়ের প্রবৃদ্ধি তার চেয়ে সামান্য বেশি হলেও ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ লক্ষ্যের তুলনায় এখনও অনেক কম।
নির্বাচনের পর বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে ব্যাংক ঋণের চাহিদাও বাড়বে—এমন প্রত্যাশা করেছিলেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। বরং জ্বালানি সংকট, গ্যাস ও তেলের ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে।
এর সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ করেছে। ফলে নতুন কারখানা স্থাপন বা বিদ্যমান ব্যবসা বড় করার পরিবর্তে অনেক উদ্যোক্তা এখন পরিস্থিতি সামলাতেই ব্যস্ত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পর বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ বাড়বে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যোগ শুরু করছেন না। তবে আগামী মাসগুলোতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানেও কয়েক মাস ধরে ঋণ প্রবাহের দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট। মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এপ্রিলে তা ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মার্চে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। জুনে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এর ফলে জুন পর্যন্ত টানা চার মাস প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে ছিল। জুলাইয়ে সামান্য উন্নতি হলেও পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
ব্যাংকারদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমার প্রবণতা শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই। ওই সময় বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী তাদের কিছু ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। এরপর অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের গতি কমতে থাকে।
শুধু নতুন বিনিয়োগ নয়, চালু থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। উৎপাদন কমে গেলে কাঁচামাল কেনা, যন্ত্রপাতি আমদানি, নতুন কর্মী নিয়োগ কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজনও কমে যায়। ফলে ব্যাংক ঋণের চাহিদায়ও তার প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ার মূল শর্ত হলো ঋণের চাহিদা তৈরি হওয়া। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না। এর প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। গ্যাস ও জ্বালানির তীব্র ঘাটতি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা শুধু ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার বিষয় নয়। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও নতুন ঋণের চাহিদা কমে গেছে। একদিকে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও আগের মতো সহজে ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। ফলে ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—দুই দিকেই চাপ তৈরি হয়েছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. তৌহিদুল আলম খান মনে করেন, বেসরকারি খাতে রেকর্ড কম ঋণ প্রবৃদ্ধির পেছনে চাহিদা ও সরবরাহ—দুই পক্ষের সমস্যাই কাজ করছে।
ব্যাংকের দিক থেকে বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে উঠছে। নতুন ব্যবসা বা অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ঋণ দেওয়ার বদলে অনেক ব্যাংক তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ঋণপত্রে অর্থ রাখার দিকে ঝুঁকছে। এতে বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ আরও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দিক থেকেও পরিস্থিতি অনুকূল নয়। গ্যাসের ঘাটতি, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ পরিকল্পনা পুরোপুরি বাতিলও করছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু ব্যাংক ঋণের পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কারখানা স্থাপন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কাঁচামাল আমদানি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
বিশেষ করে শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যাংক ঋণ নিয়েও নতুন বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ ঋণ নিয়ে কারখানা স্থাপন করলেও পর্যাপ্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয় না। তখন ঋণের সুদ ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হয়, কিন্তু উৎপাদন থেকে প্রত্যাশিত আয় আসে না।
এ কারণে বর্তমান সময়ে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে শুধু ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার নীতি পরিবর্তন করাই যথেষ্ট নয়। ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অর্থনীতির নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানোও জরুরি।
একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের সমস্যাও সমাধান করতে হবে। খেলাপি ঋণের চাপ যত বাড়বে, ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তত বেশি সতর্ক হবে। আবার অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে যদি উৎপাদনশীল ব্যবসাগুলো প্রয়োজনীয় অর্থ না পায়, তাহলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও ধীর হতে পারে।
জুলাইয়ের ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি তাই সামান্য উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও এটিকে এখনই বড় পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এটি এখনও ৫ শতাংশের নিচে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ লক্ষ্যের তুলনায় বেশ পিছিয়ে।
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে হলে ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকেও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের সক্ষমতা ফিরে পেতে হবে। আর এর জন্য জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো সমস্যাগুলো একসঙ্গে মোকাবিলা করা জরুরি। তা না হলে ঋণ প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।

