দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে জ্বালানি সংকট নিরসনে সৌরবিদ্যুৎকে একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ। সংস্থাটির নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পোশাক কারখানাগুলোর ছাদে যথাযথভাবে সৌর প্যানেল বসানো গেলে সেখান থেকে প্রায় দুই হাজার আটশ পনেরো মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
গবেষণা অনুযায়ী, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন হবে প্রায় বারো হাজার সাড়ে ছয়শ কোটি টাকা—অর্থাৎ প্রায় একশ কোটি মার্কিন ডলারের কিছু বেশি বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ দিয়ে পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় চৌদ্দ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব বলে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে একটি অনুষ্ঠানে এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়, যেখানে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল পোশাক শিল্পের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সংস্থাটির দুজন গবেষক।
গবেষণায় দেশের তিন হাজারের বেশি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে তিনশ কারখানায় সরাসরি সমীক্ষা চালানো হয়—যা মোট কারখানার প্রায় সাড়ে দশ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় পঁচাশি শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা তাদের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। এই বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুৎ একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে গবেষক দল, যদিও বর্তমানে খাতটির মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্র তিন শতাংশ আসছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের প্রায় নয়শ কারখানার ওপর চালানো একটি পৃথক সমীক্ষায়ও দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার এখনো খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
গবেষণা বলছে, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটের গড় খরচ পড়ে মাত্র সাড়ে তিন টাকার কিছু বেশি, যা জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের দামের অর্ধেকেরও কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি কারখানার বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়ক হতে পারে।
গবেষণায় তিনশ কিলোওয়াট বা তার বেশি সক্ষমতাসম্পন্ন প্রায় দুই হাজার তিনশর বেশি কারখানাকে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সংস্থাটির একজন গবেষণা পরিচালক বলেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাত এক ধরনের সংকট-ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে। অনেক আগে থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা গেলে বর্তমান সংকট অনেকটাই লাঘব হতো বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, পোশাক খাত ধীরে হলেও ছাদে সৌরবিদ্যুতের দিকে এগোচ্ছে, যা একদিকে জ্বালানি চাপ কমাচ্ছে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি পূরণেও সহায়ক হচ্ছে।
তিনি জানান, পোশাক খাতে মোট প্রায় সাড়ে নয় লাখ বর্গমিটার জায়গা রয়েছে, যেখানে ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর সুযোগ আছে। শুধু এই জায়গা থেকেই প্রায় এক হাজার সাতশ আটষট্টি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, এই রূপান্তরের জন্য খুব বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগও প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও জানান, সব কারখানা একসঙ্গে এই পরিবর্তনে যেতে প্রস্তুত নয়। বর্তমানে প্রায় পাঁচশ কারখানা এখনই বিনিয়োগে সক্ষম, আরও প্রায় তেরোশ কারখানা যথাযথ সহায়তা পেলে এই খাতে যুক্ত হতে পারবে। তবে চারশর বেশি কারখানার ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক সহায়তা ও নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার সাড়ে দশ শতাংশের বেশি হয়ে গেলে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ব্যাংকের কাছে বিনিয়োগযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। তাই এই খাতে সবুজ অর্থায়ন বা রেয়াতি সুদহারে ঋণের ধারাবাহিক প্রাপ্যতা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সাড়ে ছয় শতাংশের কাছাকাছি সুদে গ্রিন ফাইন্যান্স পাওয়া গেলে তা সবচেয়ে কার্যকর হবে বলে গবেষণায় মত দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের বড় বড় পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির ওপর ক্রমেই বেশি জোর দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতেও বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
অনুষ্ঠানে একটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক শিল্পগোষ্ঠীর জ্বালানি বিভাগের একজন প্রধান জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে প্রায় ঊনত্রিশ মেগাওয়াট ছাদ-সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে, যা দিয়ে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র পনেরো শতাংশ এবং সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ছয় শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু কারখানার ছাদ ব্যবহার করে পুরো জ্বালানি চাহিদা মেটানো বাস্তবে সম্ভব নয়, কারণ অধিকাংশ কারখানা বহুতল হওয়ায় ছাদের জায়গা সীমিত। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, তাদের একটি কারখানার ছাদে মাত্র কয়েকশ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ পাওয়া গেছে, অথচ সেই কারখানার প্রকৃত বিদ্যুৎ চাহিদা দেড় মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতার সম্ভাবনার দিকটিও তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, চীনের উন্নত প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও সহজ শর্তের অর্থায়ন যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের শিল্প খাতে ছাদ-সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ আরও দ্রুত করা সম্ভব হবে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত শর্ত পূরণ—সব মিলিয়ে পোশাক খাতে ছাদ-সৌরবিদ্যুৎ এখন কেবল একটি বিকল্প জ্বালানি উৎস নয়, বরং ভবিষ্যৎ শিল্প প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে বলে মত দেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে সরকারি বিনিয়োগ সংস্থা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং টেকসই জ্বালানি ও পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

