সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও চলতি বছর বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় মাসে কর্মী গমন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্ধ শ্রমবাজার এবং কূটনৈতিক উদ্যোগে অগ্রগতি না হওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিএমইটির হিসাবে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন। চলতি বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা নেমে এসেছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন কর্মী কম বিদেশে গেছেন। অথচ বর্তমান সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানো।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফেব্রুয়ারিতে অঞ্চলটিতে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মীর চাহিদা বিপুলভাবে কমে গেছে। জানা যায়, এই চাহিদা ৫ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে সেখানে গিয়েছিলেন ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন কর্মী। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে। গত বছরের তুলনায় কর্মী গমন কমেছে ৪৫ দশমিক ৮০ শতাংশ।
কাতারে চলতি বছর গেছেন ৪৯ হাজার ৭৭৯ জন, যেখানে গত বছরের প্রথম নয় মাসে গিয়েছিলেন ৮০ হাজার ৫৭০ জন। বর্তমানে দেশটিতে চার লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। একসময় বছরে লাখের বেশি কর্মী যাওয়ার রেকর্ডও ছিল। চলতি বছরের মে মাসে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে কাতারের শ্রমমন্ত্রী ড. আলী বিন সাঈদ বিন সামিখ আল মাররি কয়েকটি খাতে কর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে বৈঠকের পর গত চার মাসে কর্মী প্রেরণের হারে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি।
কুয়েতে গত বছরের প্রথম নয় মাসে গিয়েছিলেন ৩৪ হাজার কর্মী। এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজারে। ভিসা জালিয়াতি ও অনিয়মের কারণে ২০১৮ সালের মার্চে দেশটি পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এরপর বিশেষ প্রশাসনিক অনুমতি ও নির্দিষ্ট কিছু খাত ছাড়া সাধারণ কর্মীদের জন্য বাজারটি আর সচল হয়নি।
একসময় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিক্ষোভের পর দেশটিতে বাংলাদেশিদের ভিজিট ও কর্মী ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ছুটিতে দেশে আসা কয়েক হাজার প্রবাসীর ভিসা বাতিল করেছে দেশটি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ৪ হাজার ৮০০।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে ধোঁয়াশা আরও গভীর হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩১ মে বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীর উৎস হিসেবে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশটির মোট বিদেশি শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ শতাংশই বাংলাদেশি। অন্তর্বর্তী সরকার চেষ্টা করেও বাজারটি খুলতে পারেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে যাচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। বাজারটি কবে কার্যকরভাবে খুলবে, তারও স্পষ্ট রূপরেখা মেলেনি।
এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল জানান, বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার খবরটি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। পুত্রজায়ায় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার পাঁচ বছরের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘থার্টিন্থ মালয়েশিয়া প্ল্যান ২০২৬-৩০’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদেশি শ্রমিকের অংশগ্রহণ ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ফলে বাজার চালু হলেও কত কর্মী যাওয়ার সুযোগ মিলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
জাপানের ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান বড়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর ২৫ মে জাপান সফরে গিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নেবে জাপান। কিন্তু ২০২৫ সালে দেশটিতে গেছেন মাত্র ১ হাজার ৫৬৪ জন। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে গেছেন ১ হাজার ৬০৮ জন।
শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার প্রভাব রেমিট্যান্স প্রবাহেও পড়তে শুরু করেছে। মে মাসের পর টানা চার মাস রেমিট্যান্স ৩০০ কোটি ডলারের মাইলফলক ছুঁতে পারেনি। অথচ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে টানা ছয় মাস প্রতি মাসে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছর রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং দেশটির আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যানে বাজার চালুর সুযোগ নতুন করে ধাক্কা খেয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কার্যকর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বড় বাজারগুলোয় নতুন কর্মী নিয়োগ থমকে গেছে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত শক্তিশালী অভিবাসনকেন্দ্রিক কূটনীতি গড়ে ওঠেনি। অনিয়মে জর্জরিত নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কর্মীদের এক ধরনের ‘ঋণ দাসত্বে’ ঠেলে দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, শুধু রাজনৈতিক বা নির্বাচনী ইশতেহার যথেষ্ট নয়। বিএমইটি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বাজারের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা উচিত। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের মান বাড়াতে হবে এবং নতুন দেশ ও খাতে শ্রমবাজার খুলতে দক্ষ কর্মকর্তা ও শক্তিশালী অভিবাসন কূটনীতি সক্রিয়ভাবে কাজে লাগাতে হবে।
সক্ষমতার ঘাটতিও স্পষ্ট। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী গত সোমবার এক জাতীয় পরামর্শ সভায় বলেন, এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সক্ষমতার মাত্র ৫৫-৬০ শতাংশ বর্তমানে দেশে রয়েছে। তাই সক্ষমতা বাড়াতে আরও জোরালো উদ্যোগ দরকার। বিএমইটির অধীনে বর্তমানে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে এবং উপজেলা পর্যায়ে আরও ৫০টি কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। তবে এসব কেন্দ্রের প্রশিক্ষণার্থীদের বেশির ভাগেরই বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই।
প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, প্রবাসে কর্মীদের কাজের সুযোগের পাশাপাশি উপযুক্ত বেতন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে বছরে ৮-১০ লাখ কর্মী যাচ্ছেন, যা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। কোন দেশে কী চাহিদা আছে তা চিহ্নিত করে গন্তব্য দেশের ভাষা ও কারিগরি দক্ষতায় কর্মীদের গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ শ্রমবাজার চালুর জন্য কাজ শুরু হয়েছে এবং কয়েকটি দেশে সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে সংকট থাকলেও বৈদেশিক শ্রমবাজার শিগগিরই ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে বন্ধ শ্রমবাজার খোলেনি, অন্যদিকে নতুন কর্মী প্রেরণে প্রবৃদ্ধিও নেই। ফলে দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি।
এই সংকটের কয়েকটি স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান এখন বিশাল। বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ কর্মী পাঠানোর দাবির বিপরীতে নয় মাসে গেছেন সাড়ে ৫ লাখের কিছু বেশি। এক কোটি কর্মীর লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বছরে গড়ে ২০ লাখ কর্মী পাঠাতে হবে, যা বর্তমান গতির দ্বিগুণেরও বেশি। সৌদি আরবের ওপর অতিনির্ভরতাও ঝুঁকি বাড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় বাজারে ৪৫ শতাংশের বেশি পতন পুরো হিসাব উল্টে দিয়েছে। নতুন বাজার তৈরিতে জাপানের মতো দেশের প্রতিশ্রুতি এখনো কাগজেই সীমিত।
রেমিট্যান্সে ধীরগতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। ধারাবাহিকভাবে নতুন কর্মী না গেলে কয়েক মাস পর এই প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। তাই বন্ধ বাজার খোলা, দক্ষতা বাড়ানো, নিয়োগ ব্যয় কমানো এবং শক্তিশালী শ্রম কূটনীতি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। প্রতিশ্রুতির চেয়ে দৃশ্যমান ফলাফলই প্রবাসী শ্রমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

