রাজধানীর বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের চাপের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে সবজি ও মাছের বাজার। আয় বাড়ছে না, অথচ বাজার খরচ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য প্রতিদিনের বাজার করা যেন আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এক কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
সংসারের প্রয়োজনীয় সবজি কিনতেই যখন আয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে, তখন মাছ বা মাংস কেনার সামর্থ্য অনেকেরই থাকছে না। ফলে খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করেও পরিবারের মাসিক ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাইফুল আলমের অভিজ্ঞতাই এই চাপের একটি বাস্তব চিত্র। তাঁর অভিযোগ, গ্রীষ্মকালে যে দামে সবজি বিক্রি হতো, এখনো অনেক সবজির দাম সেই উচ্চ অবস্থানেই রয়েছে।
তিনি বলেন, বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সবজি কিনতে কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। ফলে মাছ কেনার মতো আর সামর্থ্য থাকে না। সংসারের খরচ সামলাতে বাধ্য হয়ে মাছ বাদ দিতে হচ্ছে।
কয়েকটি পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিতে তার প্রভাব খুব একটা পড়েনি বলেও জানান তিনি। কারণ একটি-দুটি পণ্যের দাম কমার বিপরীতে অধিকাংশ প্রয়োজনীয় সবজির দাম এখনো বেশ চড়া।
বেশিরভাগ সবজিই ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি
শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর ৬, ১০ ও ১৩ নম্বর এবং শেওড়াপাড়ার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে।
অর্থাৎ চার সদস্যের একটি পরিবার যদি প্রতিদিনের রান্নার জন্য কয়েক ধরনের সবজি কিনতে চায়, তাহলে শুধু সবজির পেছনেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজ, রসুন, আদা কিংবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যোগ হলে বাজারের মোট খরচ আরও দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
মিরপুর ১৩ নম্বরের সবজি বিক্রেতা আরিফুল ইসলাম জানান, পাইকারি বাজারে অধিকাংশ সবজির দাম তেমন কমেনি। ফলে খুচরা বাজারেও দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হয়নি।
তার বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—খুচরা বাজারে দামের চাপ শুধু বিক্রেতাদের ইচ্ছার কারণে তৈরি হচ্ছে না। পাইকারি পর্যায়েও দাম বেশি থাকায় সেই চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়ছে।
কোন সবজির কত দাম
বর্তমানে পটোল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকা। কাঁকরোল ১০০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং দেশি শসা ১০০ টাকা কেজি।
হাইব্রিড শসার দাম তুলনামূলক কম, প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা। ঢেঁড়স, বরবটি ও ঝিঙে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে।
বেগুনের দাম জাতভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। মিষ্টিকুমড়া ৬০ টাকা, গাজর ১২০ টাকা, লাউ ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং চালকুমড়া ৮০ টাকা কেজি।
কচুর মূল ও কচুর লতি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। পেঁপের দাম তুলনামূলক কম, প্রতি কেজি ৪০ টাকা।
চারটি কাঁচা কলার একটি গোছার দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
শাকপাতার দামও খুব বেশি নয় বলে মনে হলেও পরিবারের দৈনন্দিন বাজারে এসব ছোট ছোট খরচ মিলেই মোট ব্যয় বড় হয়ে ওঠে। এক গোছা লালশাক ও কলমিফুল বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। লাউশাক, পুঁইশাক ও লালশাকের ডাঁটা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা গোছা।
সবজির পর মাছ কিনতে গিয়ে থমকে যেতে হচ্ছে
সবজির বাজারের পর মাছের বাজারে গেলেই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা কেজি। ৪০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম কেজিতে ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি। আর ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি।
অর্থাৎ পরিবারের কয়েকজন সদস্যের জন্য একটি মাঝারি আকারের ইলিশ কিনতেই একজন সাধারণ পরিবারের এক দিনের বা তারও বেশি সময়ের খাবারের বাজেটের বড় অংশ শেষ হয়ে যেতে পারে।
অন্য মাছের দামও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ১ থেকে ১ দশমিক ৫ কেজি ওজনের রুই ও কাতলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকা। ২ কেজি ওজনের মাছের দাম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি।
নদীর মাছের মধ্যে আইড় বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি। কাচকি ৬০০ টাকা, পাবদা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং টেংরা ৮০০ টাকা কেজি। বড় আকারের চিংড়ির দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি।
ফলে মাছের বাজারে গিয়ে ক্রেতাদের সামনে দুটি পথই যেন খোলা থাকছে—হয় পরিমাণ কমাতে হবে, নয়তো অন্য কোনো প্রয়োজনীয় পণ্য বাদ দিতে হবে।
মাংস ও ডিমেও স্বস্তি নেই
শুধু সবজি ও মাছ নয়, প্রাণিজ আমিষের অন্যান্য উৎসের দামও সাধারণ পরিবারের জন্য যথেষ্ট চাপ তৈরি করছে।
গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি। খাসির মাংসের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি।
ব্রয়লার মুরগি পাওয়া যাচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে। সোনালি মুরগির দাম ৩৩০ টাকা এবং লেয়ার মুরগির দাম ৩৬০ টাকা কেজি।
খামারের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা ডজন।
একটি পরিবারের খাদ্যতালিকায় সবজি, মাছ, মাংস, ডিম—সবকিছু একসঙ্গে রাখতে গেলে মাসিক খাদ্য ব্যয়ের ওপর যে বড় চাপ তৈরি হচ্ছে, এই দামগুলো তারই ইঙ্গিত দেয়।
রান্নাঘরের আরও কিছু পণ্যের দাম
নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা ও অন্যান্য পণ্যের দামও কম নয়।
দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। জাতভেদে আলুর দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আদার দাম ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি।
দেশি রসুন ১২০ টাকা এবং আমদানি করা বড় রসুন ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এসব পণ্যের প্রতিটির দাম আলাদাভাবে খুব বড় মনে না হলেও মাসের পুরো বাজারের হিসাব করলে এগুলোর সম্মিলিত প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে যেসব পরিবারে আয়ের বড় অংশ খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়, তাদের জন্য সামান্য দাম বৃদ্ধিও বড় চাপ তৈরি করে।
কেন বাজারের চাপ কমছে না?
বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কিছু পণ্যের দাম কমলেও সামগ্রিকভাবে মানুষের বাজার খরচ কমছে না। এর কারণ বাজারের সব পণ্যের দাম একই সময়ে কমছে না।
একটি পরিবারের বাজারের ঝুড়িতে শুধু একটি পণ্য থাকে না। সবজি, মাছ, ডিম, মাংস, চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা—সবকিছুর দাম মিলিয়েই মাসিক খাদ্য ব্যয় নির্ধারিত হয়।
ফলে একটি নির্দিষ্ট সবজির দাম কমলেও অন্য সবজির দাম যদি অপরিবর্তিত থাকে এবং মাছ বা মাংসের দাম বেশি থাকে, তাহলে পরিবারের মোট ব্যয়ে স্বস্তি আসে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে অধিকাংশ সবজির পাইকারি দাম যদি স্থির থাকে, তাহলে খুচরা পর্যায়ে বড় ধরনের দরপতনের সম্ভাবনাও কম। বিক্রেতারা পাইকারি পর্যায়ে যে দামে পণ্য কিনছেন, তার সঙ্গে পরিবহন, দোকান পরিচালনা ও অন্যান্য খরচ যোগ করে বিক্রি করতে হচ্ছে।
তাই ভোক্তার কাছে বাজারদর কমাতে হলে শুধু খুচরা পর্যায়ে নজরদারি করলেই হবে না; সরবরাহব্যবস্থা ও পাইকারি বাজারের দিকেও নজর দিতে হবে।
আয়ের সঙ্গে বাজার খরচের ব্যবধানই বড় সংকট
এই বাজার পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। কারণ এসব পরিবারের আয় সাধারণত নির্দিষ্ট, কিন্তু বাজারদর প্রতিদিনের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
আয় একই থাকলে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে পরিবারের হাতে অন্য খরচের জন্য অর্থ কমে যায়। তখন চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত, পোশাক কিংবা সঞ্চয়ের মতো প্রয়োজনীয় খাতেও কাটছাঁট করতে হয়।
সাইফুল আলমের ‘সবজি কিনতেই টাকা শেষ, মাছ বাদ দিতে হচ্ছে’—এই অভিজ্ঞতা তাই শুধু একজন ক্রেতার ব্যক্তিগত হতাশা নয়। এটি মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের খাদ্যাভ্যাস ও ব্যয়ের ধরনে যে পরিবর্তন আসছে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ।
বাজারে স্বস্তি ফেরাতে শুধু দাম কমার অপেক্ষা যথেষ্ট নয়
কাঁচাবাজারে স্থায়ী স্বস্তি আনতে হলে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে নজর দেওয়া জরুরি। উৎপাদন থেকে পাইকারি বাজার, পরিবহন থেকে খুচরা বিক্রি—প্রতিটি ধাপে অযৌক্তিক ব্যয় ও অতিরিক্ত মূল্য সংযোজন কমানো না গেলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো কঠিন।
একই সঙ্গে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মৌসুমি পণ্যের উৎপাদন ও সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো একটি পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে তার প্রভাব দ্রুত খুচরা বাজারে পড়ে।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানুষের আয় ও বাজারদরের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। শুধু পণ্যের দাম কিছুটা কমলেই হবে না; মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
কারণ বাজারে পটোল ৮০ টাকা, গাজর ১২০ টাকা কিংবা ইলিশ ৩ হাজার টাকা কেজি—এই সংখ্যাগুলো তখনই মানুষের কাছে বড় হয়ে ওঠে, যখন সেই দামের বিপরীতে তাদের আয় বাড়ে না।
রাজধানীর কাঁচাবাজারের বর্তমান চিত্র তাই শুধু ‘দাম বেশি’—এই সরল সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আয়, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়—সবকিছু।
সবজি কিনতেই যদি পকেট খালি হয়ে যায়, তাহলে মাছের বাজারে না যাওয়াই স্বাভাবিক। আর এমন বাস্তবতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাজারের চাপ শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ধীরে ধীরে তা পরিবারের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর আরও গভীর প্রভাব ফেলবে।

