ধর্মীয় আবেগ, মবের আধিপত্য ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্ম একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অনুভূতির নাম। মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ধর্ম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু প্রশ্নটি ধর্ম নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো ধর্মের নামে কে সিদ্ধান্ত নেবে কোন গান চলবে, কোন নাটক হবে, কোথায় নৌকাবাইচ হবে কিংবা কার পোশাক কেমন হবে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট, লোকজ উৎসব ও নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে আপত্তি, হুমকি ও চাপ প্রয়োগের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে। বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি, কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিল এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে সংঘাত এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কারণ, এখানে মূল প্রশ্ন কোনো একটি অনুষ্ঠান নয়; প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের অনুমোদিত আইন ও প্রশাসনের বাইরে একটি গোষ্ঠী কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে।
সমস্যা ধর্মীয় বিশ্বাসে নয়, ‘ভেটো ক্ষমতায়’
বাংলাদেশে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন অবাধে অনুষ্ঠিত হওয়ার অধিকার আছে, তেমনি দেশের লোকজ সংস্কৃতি, বাউল গান, নাটক, সিনেমা, কনসার্ট কিংবা নৌকাবাইচও মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকার ও ঐতিহ্যের অংশ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো আয়োজন অপছন্দ করতেই পারে। প্রতিবাদও করতে পারে। কিন্তু অপছন্দের কারণে শক্তি প্রদর্শন করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।
যখন কোনো সংগঠিত বা অর্ধসংগঠিত জনতা মনে করে তাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যাই শেষ কথা, তখন তারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের আইনের জায়গায় নিজেদের নৈতিক পুলিশিং প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই প্রবণতা শুধু সংস্কৃতির জন্য নয়, আইনের শাসনের জন্যও হুমকি।
আজ নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি উঠছে, কাল বইমেলা, নাটক বা সিনেমার বিরুদ্ধে উঠতে পারে। আজ নারীর পোশাক নিয়ে আপত্তি, কাল তার শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র কিংবা চলাচলের অধিকার নিয়েও আপত্তি উঠতে পারে। মবের ক্ষমতার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। একবার রাষ্ট্র দুর্বলতার সংকেত দিলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ গোষ্ঠী।
‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ের আড়ালে দায়হীন শক্তি?
‘তৌহিদী জনতা’ শব্দটি ধর্মীয় অর্থে অত্যন্ত ব্যাপক। কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলাদেশে এটি অনেক ক্ষেত্রে এমন একটি মব পরিচয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার নির্দিষ্ট নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহি স্পষ্ট নয়। ফলে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রশ্ন ওঠে কারা এর নেতৃত্ব দিল? কার নির্দেশে জনতা জড়ো হলো? আইন ভাঙলে দায় নেবে কে?
এই দায়হীনতাই মব রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি।
একটি রাজনৈতিক দলের নাম থাকলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়। নিবন্ধিত সংগঠন থাকলে তার নেতৃত্বকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু ‘জনতার’ নামে সংঘবদ্ধ শক্তি প্রয়োগ করলে ব্যক্তিগত অপরাধটি মুহূর্তেই একটি অস্পষ্ট জনসমষ্টির মধ্যে হারিয়ে যায়।
রাষ্ট্রের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্মের নামে আইন নিজের হাতে নিলে, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কি একইভাবে ব্যবস্থা নেবে?
আইনের প্রয়োগ যদি পরিচয় দেখে হয়, তাহলে আইন আর আইন থাকে না; সেটি শক্তিশালীদের সুবিধার হাতিয়ার হয়ে যায়।
সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো তারা সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের অধিকার কতটা নিশ্চিত করতে পারে।
সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ফেলবে এটি বাস্তবতা। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দই যদি সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের মানুষের অধিকার নির্ধারণ করে, তাহলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কোনো একরৈখিক ইতিহাস নয়। এখানে ইসলামি সংস্কৃতির পাশাপাশি বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, নৌকাবাইচ, বৈশাখী উৎসব, নাটক, কবিতা সবকিছু মিলেই বাঙালির সামাজিক পরিচয় তৈরি হয়েছে।
এই বহুত্বকে দুর্বলতা মনে করা ভুল।
বরং বহুত্বই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক শক্তি। যে সমাজে ভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতি পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে, সেই সমাজই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকে।
রাষ্ট্র কি দর্শক হয়ে থাকবে?
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা। কোনো গোষ্ঠী হুমকি দিলে প্রশাসন যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে অনুষ্ঠান বাতিল করে, তাহলে বার্তাটি পরিষ্কার ‘হুমকি কার্যকর’।
এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির।
কারণ তখন ভবিষ্যতে কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করতে আদালতে যেতে হবে না, আইনগত আপত্তি তুলতে হবে না; কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে চাপ সৃষ্টি করলেই যথেষ্ট হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো পক্ষের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পছন্দ নির্ধারণ করা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো আইন মানা নিশ্চিত করা এবং সবার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা।
যে দেশে মাজার ভাঙচুর থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের চেষ্টা পর্যন্ত মবের উপস্থিতি দৃশ্যমান, সেখানে শুধু নিন্দা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত, দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ।
বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সংকট
দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনাগুলো এখন আর দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ভিডিও, একটি হামলা কিংবা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের খবর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশকে যদি ক্রমাগত এমন একটি দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে ধর্মীয় চাপের মুখে সংস্কৃতি, নারী কিংবা ভিন্নমত নিরাপদ নয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু রাজনীতিতে পড়বে না; বিনিয়োগ, পর্যটন, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও পড়বে।
একটি দেশের ভাবমূর্তি তৈরি হয় শুধু সরকারের বিজ্ঞাপনে নয়। নাগরিকরা রাস্তায় কী করছে, সংখ্যালঘুরা কতটা নিরাপদ, শিল্পী কী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন এসব দিয়েও একটি দেশের পরিচয় গড়ে ওঠে।
তাই উগ্রতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো বিশেষ মতাদর্শের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে আজ মূল দ্বন্দ্ব ধর্ম বনাম সংস্কৃতির নয়। প্রকৃত দ্বন্দ্ব হলো আইনের শাসন বনাম মবের শাসন।
ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, মানুষের বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকবে। একই সঙ্গে শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদনের অধিকারও থাকবে। একটি অধিকার রক্ষার নামে আরেকটি অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশ চলবে সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে, নাকি সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ও সংগঠিত জনতার হুমকির ভিত্তিতে?
সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া কোনো লাইসেন্স নয় যে, ভিন্নমতকে চুপ করিয়ে দেওয়া যাবে। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রকৃত শক্তি তার সহনশীলতায়।
রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, মব তখন শক্তিশালী হয়। আর মব যখন রাষ্ট্রের জায়গা নিতে শুরু করে, তখন বিপদে পড়ে শুধু কোনো গান, নাটক বা নৌকাবাইচ নয়, বিপদে পড়ে পুরো সমাজের স্বাধীনতা।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে একটি সহজ কিন্তু কঠিন সিদ্ধান্তের ওপর: আইনের শাসন কি সবার
জন্য সমান থাকবে, নাকি রাস্তায় সবচেয়ে জোরে চিৎকার করা গোষ্ঠীই ঠিক করবে ‘এই দেশে কী চলবে আর কী চলবে না’?

