সরকার আগামী তিন বছরে তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। তবে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোর উপযোগিতা যাচাই না করেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় পাইপলাইন, জমি অধিগ্রহণ, নাব্যতা ও পরিবেশগত জটিলতা মিলিয়ে এসব প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী সম্প্রতি হিরণ পয়েন্ট, মোংলা ও পায়রায় তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু এসব স্থানে এখনো প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়নি। এমনকি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য তিনটি স্থান কতটা উপযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সমস্যার বড় জায়গা হলো, এসব এলাকার আশপাশে বড় শিল্পকারখানা তুলনামূলক কম। ফলে স্থানীয়ভাবে গ্যাসের চাহিদাও সীমিত। টার্মিনাল থেকে এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করার পর তা স্থলভাগে পৌঁছাতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। এরপর জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতেও প্রয়োজন হবে দীর্ঘ সঞ্চালনলাইন।
অর্থাৎ টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি আলাদা অবকাঠামো ও বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এতে শেষ পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
হিরণ পয়েন্টে বড় বাধা সুন্দরবন
হিরণ পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে গ্যাস পরিবহনের পাইপলাইন।
উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের গবেষণা অনুযায়ী, মোংলা বন্দর থেকে নদীপথে হিরণ পয়েন্টের দূরত্ব ১৩১ কিলোমিটার এবং সরাসরি দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। মোংলার কাছাকাছি জাতীয় গ্যাস সঞ্চালনলাইন খুলনায়, যা আরও প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে।
ফলে হিরণ পয়েন্টে টার্মিনাল করা হলেও গ্যাস ব্যবহারযোগ্য করতে দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। সেই পাইপলাইন বসাতে শতাধিক নদী ও খাল পার হতে হবে। পাশাপাশি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য এবং বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এলাকার মধ্য দিয়েও পাইপলাইন নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এ ধরনের প্রকল্পে পরিবেশগত সমীক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনুমোদনও প্রয়োজন হতে পারে। ফলে অর্থায়ন, পরিবেশগত অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন—সব মিলিয়ে এটি সহজ প্রকল্প নয়।
মোংলা পর্যন্ত গ্যাস পৌঁছানোর পরও কাজ শেষ হবে না। সেখান থেকে খুলনায় জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে আবার নতুন পাইপলাইন প্রয়োজন হবে।
মোংলায় গ্যাসের চাহিদাই বড় প্রশ্ন
মোংলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। এর ওপর এলাকায় বড় শিল্পকারখানার সংখ্যা এখনো সীমিত। বড় কোনো গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও সেখানে নেই।
মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে। ভবিষ্যতে সেখানে কী ধরনের শিল্পকারখানা হবে, তার ওপর গ্যাসের চাহিদা নির্ভর করবে। কিন্তু সেই সম্ভাব্য চাহিদা নিশ্চিত না করেই টার্মিনাল নির্মাণ করলে বিনিয়োগ কতটা যৌক্তিক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
আরেকটি সমস্যা হলো মোংলা বন্দরের নাব্যতা। পশুর নদীতে পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় বড় জাহাজের একটি অংশ সুন্দরবনের হারবাড়িয়ায় অবস্থান করে। সেখান থেকে ছোট জাহাজে পণ্য বন্দরে আনা হয়।
তাই মোংলায় এলএনজি টার্মিনাল হলে বড় এলএনজিবাহী জাহাজ কীভাবে সেখানে পৌঁছাবে, সেটিও আলাদাভাবে সমাধান করতে হবে।
পরিবেশগত বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা বন্দর সুন্দরবন থেকে মাত্র সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে। বন্দর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। সুন্দরবনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা ও বিতর্ক হয়েছে।
পায়রার পরিকল্পনা আগেও বাতিল হয়েছিল
পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৭ সালে সেখানে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল।
সে সময় জার্মানির সিমেন্স এনার্জির সঙ্গে যৌথভাবে ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিও করা হয়। পরে ২০২১ সালে পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়।
তবে সমীক্ষায় দেখা যায়, রামনাবাদ চ্যানেলে পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকায় বড় এলএনজি কার্গো সেখানে সরাসরি ভিড়তে পারবে না। নিয়মিত ড্রেজিং অথবা লাইটারেজের মাধ্যমে এলএনজি পরিবহন করতে হলে প্রকল্পটি লাভের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত পায়রায় এলএনজি টার্মিনাল এবং এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে তৎকালীন সরকার।
ঢাকায় গ্যাস নিতে লাগবে আরও ২২১ কিলোমিটার পাইপলাইন
পায়রায় টার্মিনাল নির্মাণ করলেই ঢাকার শিল্পকারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সহজে গ্যাস পৌঁছে যাবে—এমন নয়।
পায়রা থেকে বরিশাল শহরের দূরত্ব ১০৬ কিলোমিটার। বরিশাল থেকে খুলনা ১১৫ কিলোমিটার এবং মাওয়া পর্যন্ত দূরত্ব ১৩৬ কিলোমিটার।
ঢাকায় গ্যাস পৌঁছাতে পায়রায় টার্মিনাল ও সিটিএমএস স্থাপনের পাশাপাশি নতুন করে ২২১ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। এত বড় অবকাঠামো তৈরির খরচ শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দামও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফলে শিল্প ও সাধারণ ভোক্তাদের জন্য সেই গ্যাস কতটা সাশ্রয়ী থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
ভোলা থেকে গ্যাস আনার পরিকল্পনাও ব্যর্থ
বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোটের সদস্য সচিব হাসান মেহেদীর মতে, আগের অভিজ্ঞতাও নতুন করে ভাবার কারণ তৈরি করে।
তিনি বলেন, ২০২২ সালে ভোলা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকায় গ্যাস আনার উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। নদীর তলদেশ বা সেতুর সঙ্গে পাইপলাইন স্থাপনের বিপুল খরচের কারণে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসা হয়।
এরপর ২০২৪ সালে এলএনজিতে রূপান্তর করে ভোলা থেকে ঢাকায় গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সেটিও বাতিল করা হয়।
তার প্রশ্ন, ভোলা থেকে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার দূরের বরিশাল শহরেই যেখানে এখনো গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি, সেখানে তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করে দূরবর্তী শিল্পাঞ্চলে গ্যাস পৌঁছানোর পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত?
সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ
হাসান মেহেদীর মতে, শুধু নতুন নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ করে দেশের জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নীতির ফলেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
তার পরামর্শ, জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে যেতে হবে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি শুধু তিনটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে কি না, তা নয়। বরং যেখানে গ্যাসের চাহিদা কম, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ নেই, পাইপলাইন নির্মাণে বিপুল ব্যয় হবে এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়েছে—সেসব জায়গায় বড় বিনিয়োগ কতটা যৌক্তিক, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

