দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্প এখন গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে চরম বিপাকে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি খরচ বেড়ে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানার টিকে থাকাই এখন প্রশ্নের মুখে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পানির কল তৈরির একটি প্রতিষ্ঠান এক যুগের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও চাহিদা কমার কারণে এমনিতেই কয়েক মাস ধরে ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না প্রতিষ্ঠানটির। এর মধ্যে সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ষাট শতাংশের বেশি কমে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, পিতল গলানোর জন্য কারখানায় সার্বক্ষণিক গ্যাসের চুলা চালাতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ। কিন্তু গত চার-পাঁচ মাস ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় এবং বর্তমানে তা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিনে মাত্র তিন-চার ঘণ্টার বেশি কারখানা চালানো যাচ্ছে না। তাঁর ভাষ্যে, প্রতিদিন কারখানা চালু রাখতে যে পরিমাণ খরচ হয়, তা তুলতে হলে যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন দরকার, বর্তমান সংকটে তার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে—ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। উৎপাদন কমার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও; এক বছর আগে যেখানে প্রায় ত্রিশজন কর্মী কাজ করতেন, এখন সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র বারোজন।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় এই ধরনের পানির ট্যাপ তৈরির প্রায় সাড়ে তিনশ ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। বড় কারখানাগুলোর নিজস্ব পিতল গলানোর ব্যবস্থা থাকলেও ছোট উদ্যোক্তারা অন্যদের কাস্টিং সুবিধা ব্যবহার করে পণ্যের প্রাথমিক আকার তৈরি করান। ফলে বর্তমান গ্যাস-সংকট পুরো এলাকার প্রায় সব কারখানার উৎপাদনেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সংশ্লিষ্ট একটি শিল্প সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার হালকা প্রকৌশল কারখানা রয়েছে, যেখানে কর্মরত আছেন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া ও পাবনার মতো প্রধান শিল্প-ক্লাস্টারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক এলাকায় দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন প্রক্রিয়া গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ধাতু গলানো বা তাপ প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমনিতেই হালকা প্রকৌশল পণ্যের বাজার-চাহিদা কমে গেছে। তার সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন নেমে গেছে অর্ধেকের নিচে, ফলে কর্মীদের বেতন পরিশোধ ও ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য।
ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতেও একই সমস্যায় ভুগছেন উদ্যোক্তারা। গাজীপুরের একটি এলাকায় কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে, যার ফলে ক্রেতাদের চাহিদামতো সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায় এবং প্রতিবার ফিরতে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগে। আগে যে কাজ আধা ঘণ্টায় শেষ হতো, এখন তা করতে প্রায় অর্ধেক দিন লেগে যাচ্ছে। তিনি জানান, এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি, এমনকি কারখানা অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন। ছোট প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন, তাই নিজস্ব সঞ্চয় ও ধারদেনার মাধ্যমেই ব্যবসা চালাতে হচ্ছে তাঁকে।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেলেও বিল আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক উদ্যোক্তা। কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক ছাঁচ তৈরির একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গত মাসে তাদের বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে ত্রিশ শতাংশের বেশি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বর্তমানে জেনারেটর চালাতে দৈনিক প্রায় দুইশ লিটার তেল খরচ হচ্ছে। গত এক মাসে জেনারেটরের খরচ বেড়েছে চল্লিশ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে ত্রিশ শতাংশ, অথচ উৎপাদন কমেছে ত্রিশ শতাংশ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যেকোনো সময় কারখানা বন্ধ করে দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এসএমই খাতের সহায়তাকারী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, উদ্যোক্তারা নিয়মিতভাবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার কথা জানাচ্ছেন তাঁদের কাছে। সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ডার পেয়েও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না, ফলে তারা আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি, এবং উদ্যোক্তাদের এসব সমস্যা সরকারকে অবহিত করার কথাও উল্লেখ করেন।

