বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নে কেন এত ধীরগতি, তার চৌদ্দটি নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছে সরকার। ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প দলিল থেকে শুরু করে দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের সংকট, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা—এই বিষয়গুলোই মূলত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এসব সমস্যা সমাধানে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মান বাড়ানো, ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট বা ই-জিপির ব্যবহার সম্প্রসারণ, দক্ষতাভিত্তিক প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদারের মতো একাধিক উদ্যোগ ইতিমধ্যে হাতে নিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার। সংরক্ষিত মহিলা আসনের একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর পক্ষে এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণগুলো তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
তাঁর ভাষ্যে, প্রকল্পের ত্রুটিপূর্ণ দলিল প্রণয়ন, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং তথ্যের অসামঞ্জস্য—এসবই এডিপি বাস্তবায়নে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এর পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ ও বিভিন্ন সেবা লাইন স্থানান্তরে বিলম্ব, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বাড়ানো, যথাযথ সমাপ্তি পরিকল্পনার অভাব এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বও বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
এ ছাড়া গবেষণালব্ধ তথ্য যথাযথভাবে কাজে না লাগানো, স্থানীয় পর্যায়ে প্রকল্প তদারকির ঘাটতি, অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্যে অসামঞ্জস্য, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা এবং একাধিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে দায়িত্ব বণ্টন ও সমন্বয়ের ঘাটতিকেও ধীরগতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা দেশ থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরও প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনে নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না হওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। পাশাপাশি ফলাফলভিত্তিক পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কাঠামোর ঘাটতিও সামগ্রিকভাবে এডিপি বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানান তিনি।
এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে প্রকল্প গ্রহণের আগেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকল্প প্রস্তুতির মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপির ব্যবহার আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে, আর ভূমি অধিগ্রহণ ও সেবা লাইন স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তাকে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্বে রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে যাতে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
প্রকল্পগুলোর নিয়মিত পর্যালোচনা সভা এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকিও জোরদার করা হয়েছে। যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ত্রিশ শতাংশের কম, সেসব প্রকল্প খতিয়ে দেখে সেগুলো পুনর্বিন্যাস, পরিধি পরিবর্তন কিংবা চালু রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পৃথক ড্যাশবোর্ডও স্থাপন করা হচ্ছে।
সবশেষে প্রতিমন্ত্রী সংসদকে জানান, নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্ব, অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি ও সংশোধনের কারণ পর্যালোচনা করে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

