জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরও দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কমছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং এলএনজি সরবরাহ সংকটের কারণে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে লোকসান ও ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে। ফলে সরকারকে একদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি আর্থিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে ছয় মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। জ্বালানির দাম বাড়ানোর পরও ডিজেল বিক্রিতে প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের সময় সরকার জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে গড়ে প্রায় ২০৫ টাকা খরচ হচ্ছে।
নতুন মূল্য সমন্বয়ের পর দেশের বাজারে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। ফলে প্রতি লিটারে এখনো প্রায় ৭০ টাকা ঘাটতি থাকছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গত সাড়ে ছয় মাসে সংস্থাটির মাসিক গড় লোকসান প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছিল। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারত।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, প্রিমিয়াম এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। একই সঙ্গে সরবরাহ পেতেও আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির লোকসানের একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
তবে জ্বালানি খাতের আরেক বড় চাপ তৈরি হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশকে বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্পট বাজারের ওপর।
এর ফলে এলএনজি আমদানির খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা হচ্ছিল, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছে।
অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে এলএনজির দাম প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এতে পেট্রোবাংলার ওপর আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অথচ পুরো বছরের জন্য এই খাতে বরাদ্দ ছিল সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে আরও ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির জন্যও বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়বে।
বিদ্যুৎ খাতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বাড়ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাবে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের যে হিসাব ধরা হয়েছিল, তা বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল।
তিনি বলেন, মূল্য সমন্বয়ের আগে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি ছিল। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দাম সমন্বয় না করায় বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এলএনজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরবরাহ সংকটের কারণে সরকার বাধ্য হয়ে বেশি দামে স্পট বাজার থেকে এলএনজি কিনছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহকারীরা সরবরাহ দিতে না পারায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বাড়তি খরচ হলেও মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং শিল্প-কারখানার উৎপাদন সচল রাখার জন্য সরকার এই ব্যবস্থা নিচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সরকারের ভর্তুকি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর লোকসানের চাপ আরও বাড়তে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় ও ভর্তুকি দুটোই বাড়বে।
তিনি বলেন, সাময়িকভাবে মূল্য সমন্বয় করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
তার মতে, পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার কমানো, সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং কৃষিতে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা বাড়ানোর মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির চাপ কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে এলএনজি আমদানিতে। উচ্চ দামে এলএনজি কিনতে হলে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুৎ খাতেও আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকট শুধু মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের পথ।

