একসময় টনেজের হিসাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাহাজভাঙা গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ। ২০২০ সালের দিকে দেশটি বার্ষিক ৮০ লাখ টনের বেশি জাহাজ ভাঙার মধ্য দিয়ে ভারতকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও বৈশ্বিক জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সেই অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে এবার নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার, সবুজ শংসাপত্রপ্রাপ্ত (গ্রিন সার্টিফায়েড) জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের সংখ্যা ১০০-এর বেশি করা। সম্প্রতি শিল্প, বাণিজ্য ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই লক্ষ্যের কথা জানান।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩১টি গ্রিন সার্টিফায়েড ইয়ার্ড রয়েছে, এবং আরও কয়েকটি শংসাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে মাত্র ৪টি ইয়ার্ডে গ্রিন সার্টিফিকেশন ছিল। হংকং কনভেনশন কার্যকরের পর তা বাড়তে থাকে। ২০২৬ সালের মার্চে তা ২৫-এ পৌঁছায়, এবং বর্তমানে তা ৩১-এ দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ আইএমও-অথরাইজড ১৭টি ইয়ার্ডের তালিকা জমা দিয়ে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। তুরস্কের ১৮টি অনুমোদিত ইয়ার্ডের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। তবে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের কোনো ইয়ার্ডই এই তালিকায় নেই।
হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, যে সব ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করে, তারাই ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই শংসাপত্রের জন্য ইয়ার্ডগুলোর অপ্রবেশযোগ্য মেঝে ব্যবস্থা, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কর্মী নিরাপত্তার আধুনিক প্রক্রিয়া স্থাপন করতে হয়। ২০২৫ সালের ২৬ জুন হংকং কনভেনশন আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার পর থেকে শুধুমাত্র গ্রিন ইয়ার্ডগুলোই জাহাজ আমদানি ও ভাঙার অনুমতি পাচ্ছে।
শতাধিক গ্রিন ইয়ার্ডের লক্ষ্য পূরণে সরকার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি পরিবেশগত মানদণ্ড বাস্তবায়নে কঠোরতা আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো ‘ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি’ (টিএসডিএফ) স্থাপন। আইএমও-এর সহায়তায় চালানো ‘বাংলাদেশ নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনঃব্যবহার প্রকল্পের’ আওতায় এই কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সম্প্রতি একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
জাহাজ ভাঙার সময় অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু, তেলজাত বর্জ্যসহ নানা বিপজ্জনক উপাদান তৈরি হয়। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। টিএসডিএফ কেন্দ্রটি এই বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি শুধু জাহাজভাঙা শিল্পের বর্জ্যই নয়, ইলেকট্রনিক বর্জ্যসহ অন্যান্য শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনারও সুযোগ তৈরি করবে।
ইতিমধ্যে শিল্প মালিকরা সবুজায়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন। গত দুই বছরে ইয়ার্ড মালিকরা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন। ফেরদৌস স্টিল, পিএইচপি শিপ ব্রেকিং, এসএন করপোরেশন, কেবির শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড—এই প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। আরব শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ৭০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে ভারী যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে। কেবি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড বার্ষিক প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন ধাতু পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে।
তবে সবুজ শংসাপত্র থাকা সত্ত্বেও দুর্ঘটনা কমছে না। ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১৪ মাসে জাহাজভাঙা শিল্পে ৮৪টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন শ্রমিক নিহত এবং ৮১ জন আহত হয়েছেন। সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘গ্রিন লাইসেন্স’ অনেক সময় ‘গ্রিনওয়াশিং’ পরিবেশবান্ধব হওয়ার ভুয়া দাবি ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলা) মনে করে, হংকং কনভেনশন যথেষ্ট কঠোর নয়, ইয়ার্ডগুলোকে বাসেল কনভেনশনের মতো আরও কঠোর মান মেনে চলতে হবে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ৭ জন করে শ্রমিকের মৃত্যু হলেও, সবুজ ইয়ার্ডে রূপান্তরের পর ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। কেবি স্টিল ইয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি ২৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যে ফেরদৌস স্টিলসহ তিনটি প্রত্যয়িত ইয়ার্ডের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প বার্ষিক ১৫০ থেকে ২০০টি জাহাজ ভাঙে। এই খাত দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ সরবরাহ করে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। আইএমও স্বীকৃতি বাংলাদেশকে আরও বেশি আন্তর্জাতিক জাহাজমালিকের আস্থা অর্জনে সহায়তা করবে, যারা পরিবেশবান্ধব গন্তব্য খুঁজছেন।
তবে লক্ষ্য পূরণে শুধু সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। প্রতিটি ইয়ার্ডে কর্মী নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃত পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায়, ‘সবুজ’ শংসাপত্র কেবল কাগজে-কলমে আত্মতুষ্টির নামান্তর হবে। আইএমও স্বীকৃতি যেমন সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনি তা বাস্তবায়নে আরও কঠোর মনিটরিং ও শিল্পের আন্তরিকতা এখন সময়ের দাবি।

