বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশটি নতুন করে যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ ও অনুদান পেয়েছে, তার আড়াই গুণেরও বেশি অর্থ পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় করেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বাংলাদেশ বিদেশি প্রকল্প ঋণ ও অনুদান পেয়েছে ১৮ কোটি ১৮ লাখ ডলার। বিপরীতে আগের নেওয়া বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করেছে ৪৫ কোটি ৩২ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।
পরিশোধ করা অর্থের মধ্যে ৩৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার ছিল ঋণের আসল এবং ১১ কোটি ১৫ লাখ ডলার সুদ। অর্থাৎ নতুন অর্থায়নের তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে জুলাইয়ে নতুন বিদেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। গত বছরের একই মাসে নতুন প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৮৩ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, জুলাইয়ে বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংকের আইডিএ, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক, জাপান, ভারত, চীন ও রাশিয়ার কেউ নতুন কোনো ঋণ বা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
তবে আগের চুক্তির আওতায় অর্থ ছাড় অব্যাহত ছিল। জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি ৬ কোটি ৫৫ লাখ ডলার দিয়েছে এডিবি। এরপর আইডিএ ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, জাপান ৩ কোটি ৮৭ লাখ ডলার এবং ভারত ২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার ছাড় করেছে।
একই সময়ে গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় বিদেশি ঋণ ও সহায়তার অর্থছাড়ও ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যেখানে ২০ কোটি ৮ লাখ ডলার ছাড় হয়েছিল, এবার তা নেমে এসেছে প্রায় ১৮ কোটি ডলারে। বিপরীতে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
গত অর্থবছরেও বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৪৪৯ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে, যা আগের অর্থবছরের ৪০৯ কোটি ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। এর মধ্যে ২৯৫ কোটি ডলার ছিল আসল এবং ১৫৪ কোটি ডলার সুদ।
অন্যদিকে নতুন বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি নেমে এসেছে ৫২৪ কোটি ডলারে, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল ৪৭৬ কোটি ডলার।
তবে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৮০৭ কোটি ডলারের বিদেশি সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে ৭৫২ কোটি ডলার ছিল প্রকল্প ঋণ এবং প্রায় ৫৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার অনুদান।
সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, জুলাইয়ের পরিসংখ্যানকে সরাসরি নতুন অর্থায়ন সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এর বড় অংশই আগের বছরগুলোতে নেওয়া ঋণের নির্ধারিত কিস্তি ও সুদ পরিশোধের প্রতিফলন।
তবে আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। কারণ, বিদেশি অর্থায়নে নেওয়া আরও অনেক প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের পর্যায়ে প্রবেশ করবে। ফলে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করতে হবে।
মুজেরির মতে, নতুন বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হতে হবে। যেসব প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক সুফল, বৈদেশিক মুদ্রা আয় কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে, মূলত সেসব প্রকল্পেই ঋণ ব্যবহার করা উচিত।
নতুন সরকারের উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চলমান আলোচনা জুলাইয়ে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। এসব আলোচনা এগিয়ে গেলে নতুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি আবার বাড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নেওয়া ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রকল্প যাচাই, বাস্তবায়ন এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নজরদারি না থাকলে বাড়তে থাকা ঋণ পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক অর্থনীতিতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

