ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর। লোকসান হলেও টার্নওভারের ওপর বাধ্যতামূলক ১ শতাংশ কর দিতে হতো—যা ছিল ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য একপ্রকার ‘অবৈধ করের বোঝা’ এবার সেই বোঝা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন তারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সোমবার (৩১ আগস্ট) এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বার্ষিক ২ কোটি টাকা পর্যন্ত টার্নওভার বা বিক্রি আছে, এমন ব্যবসা ও কোম্পানিকে ন্যূনতম টার্নওভার কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, যাদের বার্ষিক টার্নওভার ২ কোটি টাকার নিচে, তাদের এই কর দিতে হবে না। ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকার মধ্যে বিক্রি হলে কর দিতে হবে ০.৫০ শতাংশ। আর ৪ কোটি টাকার বেশি হলে আগের মতোই ১ শতাংশ কর বহাল থাকবে। এর আগে টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ বাধ্যতামূলক কর ছিল, মুনাফা হোক বা লোকসান, সবাইকে এই কর দিতে হতো। ২০২৫ সালের বাজেটে এই কর ০.৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছিল।
এই ঘোষণার মাধ্যমে এনবিআর মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে করের বোঝা কিছুটা হলেও কমাতে চেয়েছে। বিশেষ করে যাদের মুনাফার মার্জিন কম বা যারা লোকসানে চলছে, তাদের জন্য এটি বড় স্বস্তি। সম্প্রতি জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা চরম সংকটের মুখে পড়েছেন। এই প্রেক্ষাপটেই এনবিআরের এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলছেন অনেকে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে টার্নওভারভিত্তিক এই কর ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন। এফবিসিসিআই তাদের চিঠিতে দেখিয়েছিল, ৫০ লাখ টাকা বিক্রি ও ৫ শতাংশ মুনাফা (২.৫ লাখ টাকা) থাকা একটি ব্যবসাকে বাধ্য হয়ে ৫০ হাজার টাকা কর দিতে হচ্ছে। অথচ সাধারণ আয়কর ব্যবস্থায় এই আয় করসীমার নিচে পড়ায় কোনো কর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। একইভাবে, ১ কোটি টাকা বিক্রি ও ৫ লাখ টাকা মুনাফা থাকা ব্যবসাকে ১০ হাজার টাকার বদলে ১ লাখ টাকা কর দিতে হয়েছে। টার্নওভারের ওপর এই বাধ্যতামূলক করই ছিল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।
এনবিআরের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে তারা আরও শিথিলকরণ চেয়েছেন। ফজলুল হক বলেছেন, ‘এটি একটি ভালো উদ্যোগ, কিন্তু ব্যবসায়ীরা আরও কিছু শিথিলকরণ চেয়েছিলেন’। তিনি আগেও বলেছেন, কর শেষ পর্যন্ত প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে হওয়া উচিত, এবং টার্নওভারভিত্তিক ন্যূনতম কর ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিলের পক্ষে তিনি।
কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংস্কার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে। তবে ৪ কোটি টাকার বেশি টার্নওভার থাকা কোম্পানিগুলোকে এখনও ১ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে, যা কম মুনাফা বা লোকসান থাকা বড় ব্যবসাগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয়।
ছোট ব্যবসার জন্য এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। তবে এটি শুধু ‘প্রথম ধাপ’ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তারা চান, কর ব্যবস্থা পুরোপুরি মুনাফাভিত্তিক হোক। এনবিআর যদি ভবিষ্যতে আরও শিথিলকরণ আনে, তবে ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা আরও কমবে। আর সেই সঙ্গে বাড়বে কর ফাঁকি রোধের সুযোগও।

