স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে টেকসইভাবে উত্তরণের জন্য কৃষি, ওষুধ ও এসএমইসহ বিভিন্ন শিল্পখাতের জন্য আলাদা আলাদা সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা। তাদের ভাষ্য, শুধু কাগজে-কলমে কৌশল ঠিক করলেই চলবে না—তা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, সেটাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে এ বিষয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তাদের সক্ষমতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই আয়োজন করা হয় বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে সংগঠনটি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইর প্রশাসক। শুরুতেই বাংলাদেশের এলডিসি-উত্তরণ সংক্রান্ত সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংগঠনের মহাসচিব। প্রতিবেদনে উঠে আসে, এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ যে শুল্কমুক্ত সুবিধা এখন ভোগ করছে, তা আর থাকবে না। পাশাপাশি ওষুধসহ একাধিক শিল্পখাতে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিধিনিষেধও কঠোর হবে।
খোলামেলা আলোচনায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের একজন জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনো যথেষ্ট নয়, তাই এই দিকটিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি। এর পাশাপাশি বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করতে চালু হওয়া জাতীয় সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর করার ওপরও জোর দেন তিনি।
প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের একটি সংগঠনের সভাপতি জানান, দেশের প্লাস্টিক শিল্পের একটি বড় অংশ মূলত অনুকরণভিত্তিক বা কপি পণ্য তৈরি করে থাকে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ওষুধ শিল্পের মতোই এই খাতের জন্যও মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই প্লাস্টিক ও হালকা প্রকৌশলসহ কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে সুরক্ষা দিতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দেন তিনি।
পটুয়াখালী উইমেন চেম্বারের সভাপতি সতর্ক করে বলেন, টেকসই এলডিসি-উত্তরণ কৌশল যেন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক শিল্পের স্বার্থেই সীমাবদ্ধ না থেকে যায়, সে বিষয়ে এফবিসিসিআইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ অ্যাগ্রো কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পেটেন্টের আওতাভুক্ত পণ্যগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, বেসরকারি খাতকে আগে নিজেদের নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সেসব সমস্যা সমাধানে সরকার ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ কাউন্সিল গঠন এবং সুনির্দিষ্ট ফলাফলভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পরামর্শ দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে এফবিসিসিআইর প্রশাসক বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য যে বাড়তি তিন বছর সময় পাওয়া গেছে, তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও তাতে বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সার্বিকভাবে সভায় উঠে আসা আলোচনা থেকে স্পষ্ট, এলডিসি-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু সামষ্টিক নীতি নয়, বরং প্রতিটি শিল্পখাতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে পৃথক কৌশল সাজানো এবং তার বাস্তবায়ন নিবিড়ভাবে তদারকি করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

