মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলা একটি বড় ইস্পাত কারখানা প্রকল্প এখন অর্থায়ন-জটিলতায় আটকে গেছে। শুরুতে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পরিকল্পিত এই প্রকল্পের অনুমোদিত ঋণের মধ্যে এখনো প্রায় সতেরোশ কোটি টাকারও বেশি ছাড় হয়নি, আর এদিকে প্রকল্পের যন্ত্রপাতিবাহী প্রায় ২৭৫টি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে।
২০২১ সালে বার্ষিক সাড়ে বারো লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতার এই কারখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত বছরের জুলাইয়েই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল কারখানাটির, কিন্তু এখনো তা শুরু করা সম্ভব হয়নি। কোম্পানির কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, আটটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের অনুমোদিত মোট ঋণের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র সামান্য একটি অংশ ছাড় হয়েছে, বাকি বড় অংশ এখনো আটকে আছে। এর ফলে নির্মাণকাজ শেষ করা, আমদানি করা যন্ত্রপাতি খালাস করা এবং নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখা—সবকিছুই কঠিন হয়ে পড়েছে। কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, এই বিলম্বের কারণে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় এখন খরচ বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ।
পুরো জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—প্রকল্পের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি ব্যবসায়িক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না। কোম্পানির দাবি, উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানটি একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী, যার আর্থিক হিসাব ও ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্যও আলাদাভাবে সংরক্ষিত।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে একই পরিচালকদের নিয়ন্ত্রণাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের কোনো একটি খেলাপি হলে, তার প্রভাব অন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও পড়ে। সিন্ডিকেটেড ঋণের নেতৃত্বদানকারী ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরই ঋণের অর্থ ছাড় স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনি জানান, রপ্তানিমুখী শিল্প বা বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিকারের সুযোগ আছে, এবং নতুন কোনো নির্দেশনা এলে অর্থ ছাড় সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্রও একই ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, প্রচলিত আইনের কারণেই একই মালিকানাধীন অন্য প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়া যাচ্ছে না। তবে তিনি জানান, এই বিনিয়োগ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও উদ্বিগ্ন এবং প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠানটি আবেদন করতে পারে।
কোম্পানির তথ্যমতে, প্রকল্পের জন্য আমদানি করা প্রায় ২৭৫টি কনটেইনার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে। এসব যন্ত্রপাতির প্রকৃত মূল্য পাঁচশ কোটি টাকার কিছু বেশি হলেও, বন্দরে আটকে থাকার কারণে জমতে থাকা চার্জসহ মোট খরচ এখন প্রায় নয়শ পঞ্চাশ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। প্রায় দুই বছর ধরে এসব যন্ত্রপাতি খালাস করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি, যার ফলে সার্বিক প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রায় দেড় বছর পিছিয়ে যেতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জমা দেওয়া হলেও তা অনুমোদনের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে, ফলে বাকি কাজ শেষ করার জন্য হাতে সময় খুবই সীমিত। সিন্ডিকেটে অংশ নেওয়া আট ব্যাংকের মধ্যে অর্ধেকই এখনো অর্থায়নের মেয়াদ বাড়ায়নি বলেও জানা গেছে।
উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা জানান, অর্থায়ন সংকট তীব্র হওয়ার আগেই কোম্পানি নিজস্ব তহবিল থেকে প্রকল্পে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। তার মতে, বিলম্ব যত দীর্ঘ হচ্ছে, প্রকল্পের ব্যয় তত বাড়ছে এবং এর ফলে বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতা—উভয় পক্ষের ওপরই আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি যে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি করপোরেট সত্তা এবং তাদের সিআইবি রেকর্ডও স্বতন্ত্র—এই মর্মে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র ইতিমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ পৃথক হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন করেনি, যার প্রভাব পড়েছে এই বড় বিনিয়োগে।
টাকার বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার নানা প্রতিবন্ধকতা মিলিয়ে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় চার হাজার কোটি টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত হাজার একশ কোটি টাকায়। কোম্পানির ভাষ্যমতে, ঋণ অনুমোদনের সময় ডলারের বিনিময় হার যা ছিল, বর্তমানে তা প্রায় তার দেড় গুণেরও বেশি হওয়ায় আমদানি করা যন্ত্রপাতিসহ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধযোগ্য ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, অর্থায়ন সংকটে কাজ থমকে যাওয়ার আগে প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল। একই সঙ্গে গত দেড় বছরে তাদের ঋণের সুদহারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে দ্বিগুণেরও কাছাকাছি পৌঁছেছে। যেহেতু কারখানাটি এখনো উৎপাদনে যায়নি, তাই কোনো পরিচালন আয় ছাড়াই কোম্পানিকে এই বাড়তি অর্থায়ন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে—যা প্রকল্পটিকে আরও আর্থিক চাপে ফেলছে।
মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় সত্তর একর জমিতে গড়ে উঠতে থাকা এই কারখানা চালু হলে বছরে সাড়ে বারো লাখ টন ইস্পাতের পাশাপাশি রিবার কয়েল ও ওয়্যার রডের মতো পণ্যও উৎপাদন হবে, যা বর্তমানে দেশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি করতে হয়। কারখানাটি সম্পূর্ণ চালু হলে সরাসরি প্রায় তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কোম্পানির কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, চলমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু এই একটি প্রকল্পের জন্যই নয়, বরং সিন্ডিকেটে অংশ নেওয়া আটটি ব্যাংকের জন্যও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আংশিক নির্মিত একটি বড় শিল্পস্থাপনা, বন্দরে আটকে থাকা মূল্যবান যন্ত্রপাতি এবং ক্রমবর্ধমান সুদ ব্যয়—এই তিনের সমন্বয়ে সৃষ্ট জটিলতা দ্রুত সমাধান না হলে প্রকল্পটিকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

