রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও বৈদেশিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পুরো অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা।
অর্থবছরের শুরুতে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়েও ৪৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সরকারের এভাবে ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়া ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমানের মতে, সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে দুই ধরনের ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকায় সরকারি ঋণের তাৎক্ষণিক চাপ খুব বেশি দৃশ্যমান নয়। তার ওপর বেসরকারি খাতেও ঋণের চাহিদা দুর্বল। ফলে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতেই বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়ালে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তখন বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সরকারের উচ্চ ঋণগ্রহণ ব্যাংক তহবিলের ওপর চাপ তৈরি করবে। এতে সুদের হার বাড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, চলতি মূলধন এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রভাব শুধু বেসরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আশিকুর রহমান মনে করেন, বাজেটের উন্নয়নমূলক ব্যয়ও এতে চাপের মুখে পড়তে পারে। কারণ বেতন, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের মতো ব্যয় সহজে কমানো যায় না। ফলে শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যয় কমানো বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নের মানে কাটছাঁটের চাপ তৈরি হতে পারে।
রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতি
সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় কর আদায়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।
এনবিআর সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ সংগ্রহ করে। কিন্তু অর্থবছর শেষে সংস্থাটি সংশোধিত লক্ষ্যের মাত্র ৮২ দশমিক ৬০ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে।
প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর ৪ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। সংশোধিত লক্ষ্যের তুলনায় ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
এ নিয়ে টানা দশম অর্থবছর এনবিআর সরকারের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলো। ফলে বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ক্রমেই অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাতই ছিল সবচেয়ে বড় উৎস।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, রাজস্ব আদায়ের বড় ঘাটতি এবং লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ব্যাংকঋণের অতিরিক্ত বৃদ্ধি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট করছে।
নতুন অর্থবছরে আরও বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৬-২৭ অর্থবছরেও সরকারের অর্থায়নের চাহিদা কমেনি। এবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।
এই লক্ষ্যমাত্রা আগের অর্থবছরে এনবিআরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। অর্থনীতির গতি মন্থর থাকার সময়ে এত বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা এনবিআরের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
চলতি অর্থবছরে সরকারের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতির মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই আসার কথা ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমানের মতে, ব্যাংক থেকে সরকারের উচ্চমাত্রার ঋণ নেওয়া এখন একটি বড় ধরনের ‘রাজস্ব-আর্থিক নীতির সংঘাত’ তৈরি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতে উৎপাদনশীল ঋণ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে সরকারের ঋণগ্রহণ ব্যাংকগুলোর বড় অংশের অর্থ শোষণ করছে।
ভবিষ্যতে সরকারকে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অতিরিক্ত তারল্য সরবরাহ করতে হলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
বিদেশি অর্থায়নও কমেছে
সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর আরেকটি কারণ বৈদেশিক অর্থায়ন কমে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক অর্থায়ন আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ পেয়েছে ১৮ কোটি ডলার। একই সময়ে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন ঋণ পাওয়ার তুলনায় পরিশোধের চাপ ছিল অনেক বেশি।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাকের মতে, সরকারের ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি ক্রমেই বাড়ছে। নতুন বেতন কাঠামো, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, ব্যবসায় সহায়তা, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তা এবং উন্নয়ন ব্যয়—সবকিছুর জন্যই অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন।
কিন্তু রাজস্ব আদায় সেই হারে বাড়ছে না। একই সঙ্গে ব্যয় কমানো বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় যৌক্তিক করার উদ্যোগও যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা যোগ হওয়ায় ব্যাংকঋণ সরকারের কাছে সহজ সমাধান হিসেবে সামনে আসছে।
তবে এই পথ দীর্ঘমেয়াদে কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সরকারের বিপুল ঋণগ্রহণের নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই আড়ালে রয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। তখন একই ব্যাংক তহবিলের জন্য সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা ব্যবসার ঋণ ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

