হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাব এবার সরাসরি পড়ছে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে নভেম্বর পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে কাতার এনার্জি। এর ফলে বাংলাদেশসহ এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্রেতা দেশে কাতারের নির্ধারিত এলএনজি কার্গো বাতিলের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে।
‘ফোর্স মেজর’ বলতে এমন অপ্রত্যাশিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিকে বোঝায়, যার কারণে কোনো পক্ষ সাময়িকভাবে চুক্তির নির্ধারিত শর্ত পূরণ থেকে অব্যাহতি পেতে পারে। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারির মতো পরিস্থিতিতে সাধারণত এ ধরনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী কাতার। সাধারণ সময়ে দেশটি থেকে বছরে অন্তত ৪০টি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে আসে। চলতি অর্থবছরে দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে মোট ৫৬টি কার্গো পাওয়ার কথা ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর অর্ধেক কার্গো পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।
ব্লুমবার্গের তথ্যের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজ জানিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাতারের ফোর্স মেজরের মেয়াদ সেপ্টেম্বরের পরও বাড়ানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কাতার এনার্জির কাছ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা পায়নি বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, নভেম্বর পর্যন্ত ফোর্স মেজর বাড়ানোর বিষয়ে তাদের সরাসরি কিছু জানানো হয়নি। তবে অন্যান্য ক্রেতার ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতির কথা তারা শুনেছেন।
এশিয়ায় কাতার এনার্জির আরেক বড় ক্রেতা পাকিস্তানকেও গত সপ্তাহে জানানো হয়েছে, তাদের এলএনজি কার্গো বাতিলের পরিস্থিতি অক্টোবর পর্যন্ত চলতে পারে। ইউরোপের কয়েকটি ক্রেতার কাছেও একই ধরনের নোটিশ পৌঁছেছে বলে দোহা নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো এখন বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
দেশে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সরকার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এই প্রক্রিয়াতেও সরবরাহকারীরা অন্তত ছয়টি কার্গো দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশে গ্যাসের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, আবাসিক গ্যাস সরবরাহ এবং সিএনজি খাতে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এখন স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে পেট্রোবাংলা।
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দামকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। গত সপ্তাহে দুটি কার্গো কেনা হয়েছে, যার প্রতিটির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪ ডলারের বেশি পড়েছে।
এলএনজি আমদানিতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি করতে সরবরাহকারীর তালিকাও বড় করছে পেট্রোবাংলা।
বর্তমানে সংস্থাটির তালিকায় ২৯টি কোম্পানি রয়েছে। নতুন করে আরও নয়টি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য যোগ্য বিবেচিত কোম্পানিগুলোকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মতে, সরবরাহকারীর সংখ্যা বাড়লে এলএনজি কেনার দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়বে। একই সঙ্গে কোনো একটি উৎসে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে বিকল্প সরবরাহকারী থেকে দ্রুত কার্গো সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরুর পর গত ৪ মার্চ প্রথমবারের মতো এলএনজি কার্যক্রম স্থগিত করে কাতার এনার্জি। একই সঙ্গে সরবরাহের ক্ষেত্রে ফোর্স মেজর ঘোষণা করা হয়।
এরপর বৈশ্বিক বাজারে কাতারের এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইসিসের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫০৯টি।
রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে গ্যাস বিক্রি থেকে কাতারের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বা ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাতার এনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কাতারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে গেছে।
বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বও বেশ বড়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ দুটি যৌথভাবে পাকিস্তানের এলএনজি আমদানির ৯৯ শতাংশ, বাংলাদেশের ৭২ শতাংশ এবং ভারতের ৫৩ শতাংশ সরবরাহ করে।
এসব দেশে এলএনজির বড় অংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে। ফলে সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তৈরি হলে শুধু গ্যাসের বাজার নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে সরবরাহ সংকটের কারণে ভারত শিল্প খাতে এলএনজি বরাদ্দ সীমিত করেছে। বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে আমদানি বাড়িয়েছে, আর পাকিস্তান জরুরি গ্যাস ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে।
বাংলাদেশের জন্য তাই নভেম্বর পর্যন্ত কাতারের এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্গো কমে যাওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে স্পট মার্কেটে বাড়তি দামের চাপ—দুই দিক সামলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

