বিশেষ বিশ্লেষণ
নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পেছনে একটা যুক্তি বারবার উঠে এসেছে, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে। বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজেই বলেছেন, মানুষের অভাব থাকলে দুর্নীতির দিকে ঝোঁকার একটা স্বাভাবিক প্রবণতা তৈরি হয়, আর সেই অভাব ঘুচলে দুর্নীতিও কমে আসবে বলে তার প্রত্যাশা। কথাটা শুনতে যুক্তিসংগত লাগে, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও মেলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির গবেষণা আর বাংলাদেশের নিজের ইতিহাস এই দাবিকে কতটা সমর্থন করে? বেতন বাড়ানো কি সত্যিই ঘুষের প্রবণতা কমানোর কার্যকর দাওয়াই, নাকি এটি একটি আংশিক সত্য, যা পুরো ছবিটা দেখায় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু আশাবাদ দিয়ে চলবে না, দরকার পরিসংখ্যান আর প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের সাহায্য।
যে তত্ত্বের ওপর ভর করে এই আশা
অর্থনীতিতে এই ধারণার একটা নাম আছে, ফেয়ার ওয়েজ বা ন্যায্য মজুরি তত্ত্ব। এর মূল কথা হলো, একজন কর্মী যদি মনে করেন তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য তিনি বেতন হিসেবে পাচ্ছেন, তাহলে তিনি নিয়ম ভাঙার বা অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার প্রয়োজন কম অনুভব করেন। উল্টো দিকে, বেতন যদি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে না মেলে, তাহলে ঘুষকে অনেকে নিজের কাছে “বেতনের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার” একটা যুক্তি হিসেবে দাঁড় করান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থনীতিবিদ ক্যারোলিন ভ্যান রাইকেঘেম ও বিয়াত্রিচে ভেডারের ১৯৯৭ সালের একটি গবেষণা এই তত্ত্বকে পরীক্ষা করেছিল বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের তথ্য দিয়ে। পরবর্তীতে জার্নাল অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্সে প্রকাশিত তাদের সম্প্রসারিত গবেষণায় দেখা যায়, বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারি খাতের বেতন যেসব দেশে বেশি, সেসব দেশে দুর্নীতির মাত্রা তুলনামূলক কম। তাদের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি কর্মীদের বেতন বেসরকারি খাতের গড় বেতনের দ্বিগুণ করা হলে ছয় পয়েন্টের দুর্নীতি সূচকে প্রায় অর্ধ পয়েন্ট উন্নতি দেখা যেতে পারে। সংখ্যাটা দেখতে ছোট মনে হলেও নীতিনির্ধারকদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ছিল যে বেতন-দুর্নীতির সম্পর্ক পুরোপুরি কাল্পনিক নয়।
কিন্তু গবেষণাই আবার সতর্ক করে দিচ্ছে
এখানেই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভ্যান রাইকেঘেম ও ভেডার নিজেরাই তাদের গবেষণাপত্রে স্পষ্ট করে লিখেছেন, শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হলে বেতন বাড়াতে হবে এমন এক পর্যায়ে, যা বাস্তবে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে বহন করা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি কমানোর একটি সহায়ক উপাদান হতে পারে, একমাত্র সমাধান নয়। এর সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি জটিলতা; পরবর্তী গবেষণাগুলো একমত নয়। ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল নিয়ে কাজ করা অর্থনীতিবিদ উগো পানিজ্জা ২০০১ সালে দেখিয়েছেন, সেসব দেশে বেতন ও দুর্নীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পর্কই পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র আবার বলছে, শুধু গড় বেতন নয়, বেতন কাঠামোর মধ্যকার বৈষম্য বা “ওয়েজ কম্প্রেশন” কতটা, তার ওপরও দুর্নীতির প্রবণতা অনেকাংশে নির্ভর করে। সহজ কথায়, একই দেশে একই হারে বেতন বাড়ালেও ফলাফল ভিন্ন হতে পারে দেশের শাসনব্যবস্থার মান, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর তারতম্যে। শাসনব্যবস্থার বিশেষজ্ঞ রবার্ট ক্লিটগার্ডের একটি বহুল ব্যবহৃত সূত্র আছে এই আলোচনায়, দুর্নীতি সমান হয় – একচেটিয়া ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত এখতিয়ারের যোগফল থেকে জবাবদিহিতা বিয়োগ করলে যা দাঁড়ায় তার সমান। এই সূত্র অনুযায়ী, বেতন বাড়িয়ে একজন কর্মকর্তার প্রয়োজনটুকু মেটানো গেলেও, তার হাতে থাকা একচেটিয়া ক্ষমতা বা এখতিয়ার এবং জবাবদিহিতার অভাব যদি একই রকম থেকে যায়, তাহলে দুর্নীতির সুযোগও একই রকম থেকে যাওয়ার কথা।
বাংলাদেশের নিজের অভিজ্ঞতা কী বলছে
তত্ত্ব ছেড়ে এবার দেশের বাস্তবতায় ফেরা যাক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে মোট বারো হাজার ছয়শ তেত্রিশ কোটি টাকার বেশি ঘুষ লেনদেন হয়েছে। জরিপে আরও উঠে এসেছে, সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হওয়া পরিবারের হার ২০২৩ সালের ৭০.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৮১.৬ শতাংশে, আর ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের হার বেড়েছে ৫০.৮ থেকে ৬৩.৬ শতাংশে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সময়টাতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়েনি, বরং নবম পে-স্কেলের অপেক্ষা তখনো চলছিল। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, যে যুক্তিতে বলা হচ্ছে বেতন কম থাকাই দুর্নীতির বড় কারণ, সেই যুক্তি মেনে নিলে এই সময়ে দুর্নীতি বাড়ারই কথা, আর বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। কিন্তু এর উল্টো পিঠও আছে, কারণ এই একই সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বৈশ্বিক দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) বাংলাদেশের স্কোর ২০২৪ সালের ২৩ থেকে সামান্য বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ২৪, তবু বাংলাদেশ রয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকার একেবারে ওপরের দিকে, ১৮০টি দেশের মধ্যে ত্রয়োদশ বা চতুর্দশ অবস্থানে। জরিপ অনুযায়ী পাসপোর্ট সেবায় দুর্নীতির হার সবচেয়ে বেশি, ৭৬.৬ শতাংশ, এরপরই সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সেবা, ৬৩.৫ শতাংশ। এই দুটি খাতেই দুর্নীতি মূলত সৃষ্টি হয় সেবা পাওয়ার জন্য মানুষকে নির্দিষ্ট দপ্তর বা কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করতে হয় বলে, অর্থাৎ এখানে সমস্যাটা মূলত একচেটিয়া ক্ষমতা আর জটিল প্রক্রিয়ার, যা নিছক বেতন কাঠামোর সমস্যা নয়।
২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর আসলে কী হয়েছিল
ইতিহাস ঘাঁটলে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মেলে। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সময় বাংলাদেশের সিপিআই স্কোর ছিল ২৫, বিশ্বের ত্রয়োদশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৬ সালের সূচকে স্কোর মাত্র এক পয়েন্ট বেড়ে হয় ২৬, র্যাঙ্কিংয়ে সামান্য উন্নতি হলেও তা মূলত অন্য দেশগুলোর তুলনামূলক অবস্থানের কারণে, বাংলাদেশের নিজের পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রমাণ সেখানে নেই। এরপরের এক দশকে বাংলাদেশের স্কোর মূলত পঁচিশ থেকে আঠাশের একটা সংকীর্ণ সীমার মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছে। অর্থাৎ ২০১৫ সালের বড় বেতন বৃদ্ধির পরও দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ কোনো উল্লেখযোগ্য বা স্থায়ী উন্নতি দেখাতে পারেনি। এই একটামাত্র নজির থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না, কারণ দুর্নীতির ওপর প্রভাব ফেলে এমন অনেক চলক রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এসবও একই সময়ে বদলায়। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বেতন বাড়ানো একাই বাংলাদেশে দুর্নীতির সূচক নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে পারেনি অতীতে, তাই নবম পে-স্কেলের পর একই রকম দ্রুত পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত না-ও হতে পারে।
তাহলে দাঁড়াচ্ছে কোথায়
সব মিলিয়ে সৎ ও ভারসাম্যপূর্ণ উপসংহার এটাই যে, বেতন বৃদ্ধি আর দুর্নীতি কমার মধ্যে সম্পর্ক আছে, কিন্তু সেটা সরলরৈখিক নয়। যেসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির মূল কারণ প্রকৃতপক্ষে অভাব; যেমন একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে সামান্য বকশিশ নিতে বাধ্য হন, সেখানে বেতন বৃদ্ধি সত্যিকারের স্বস্তি ও উন্নতি আনতে পারে, আর এটাই ফেয়ার ওয়েজ তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির উৎস ক্ষমতার একচেটিয়াত্ব, জটিল ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া, আর জবাবদিহিতার অভাব; যেমন পাসপোর্ট বা গাড়ির নিবন্ধনের মতো সেবা, যেখানে মানুষ একটামাত্র দপ্তরের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বেতন যত বাড়ুক না কেন, প্রক্রিয়াগত সংস্কার আর নজরদারি না বাড়ালে দুর্নীতি কমার সম্ভাবনা কম। তাই নবম পে-স্কেলকে দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি প্রয়োজনীয় কিন্তু একক পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়া সহজীকরণ আর কার্যকর জবাবদিহিতার ব্যবস্থার সঙ্গে সমান্তরালভাবে দেখাটাই বাস্তবসম্মত। আগামী দুই-তিন বছরে টিআইবির পরবর্তী জরিপ আর সিপিআই স্কোরের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে, অর্থমন্ত্রীর আশাবাদ কতটা মিলল, আর কতটা রয়ে গেল কেবল প্রত্যাশা হয়েই।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

