ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণ ও বিপর্যস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত নতুন আইনের আওতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণ কিনতে পারবে। প্রয়োজনে বন্ধক রাখা সম্পদ দখলে নেওয়া এবং অতিরিক্ত ঋণে জর্জরিত প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হবে।
খেলাপি ঋণ কেনাবেচার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক বাজার গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের এই সমস্যা মোকাবিলায় এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি নতুন ‘বিপর্যস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’-এ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশের দুর্বল ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং খাতে নতুন মূলধন আনা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ‘অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩’-এর সংশোধনী এবং নতুন ‘বিপর্যস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ দ্রুত সংসদের চলমান অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য অর্থমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান অর্থমন্ত্রীকে পাঠানো এক আধা-সরকারি চিঠিতে এই দুই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। এরই মধ্যে আইন দুটির খসড়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিপর্যস্ত সম্পদ পুনর্গঠন ও নিষ্পত্তির পথ সহজ হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, আইন দুটি কার্যকর হলে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও আরও গতি পাবে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্রের মধ্যেই নতুন উদ্যোগটি নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা।
এই ঋণের পরিমাণ দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন শ্রেণিকৃত বা সমস্যাগ্রস্ত ঋণে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা ও উদ্যোগের পরও বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। এ অবস্থায় দ্রুত ঋণ আদায় এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
প্রস্তাবিত বিপর্যস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কেনাবেচার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক বাজার তৈরি করা।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ আদায় করতে দীর্ঘ সময় লাগে। নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক চাইলে এসব ঋণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে পারবে। বিনিয়োগকারীরা ঋণ কিনে পরে তা আদায়ের উদ্যোগ নিতে পারবেন।
এ ছাড়া বন্ধক রাখা সম্পদ দখলে নেওয়া এবং ঋণগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের সুযোগও প্রস্তাবিত আইনে রাখা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও এই বাজারে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতে নতুন মূলধন প্রবাহের পাশাপাশি সমস্যাগ্রস্ত ঋণ ব্যবস্থাপনায় প্রতিযোগিতা ও দক্ষতা বাড়তে পারে।
প্রস্তাবিত আইনে ‘বিপর্যস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ নামে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
এই ইউনিটের অধীনে ‘বিপর্যস্ত সম্পদ বাস্তবায়ন টাস্কফোর্স’ নামে একটি বিশেষ কার্যকরী সংস্থা গঠনের ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এই সংস্থা সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ উদ্ধার ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মতে, এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে শুধু ঋণ আদায়ের গতি বাড়বে না, ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ের প্রকৃত চিত্রও আরও পরিষ্কার হবে।খেলাপি ঋণ আদায়ের মামলা দ্রুত শেষ করার বিষয়েও প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ ঋণ আদালত আইনের অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে আদালতে ঝুলে থাকা ঋণ আদায়ের মামলাগুলো দ্রুত শেষ করা গেলে ব্যাংকের অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
খসড়া আইনে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন, নিলামে সম্পদের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ এবং মামলার রায় কার্যকর করার জন্য পুনরুদ্ধার কর্মকর্তা নিয়োগের প্রস্তাবও রয়েছে।এ ছাড়া কোনো পক্ষ আপিল করতে চাইলে জমা দেওয়ার অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিপর্যস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন সুপারিশের আলোকে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বিপুল খেলাপি ঋণ কমানো এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও সহজ হবে।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের মতে, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে বন্ধ ও মূলধন সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ানোর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ এখনো বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে।
নতুন আইন দুটি দ্রুত কার্যকর করা গেলে দীর্ঘদিনের এই সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাতে একটি নতুন ও আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

