সরকারের ব্যয়ের চাপ দিন দিন বাড়ছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ, জ্বালানি ও সার খাতে ভর্তুকি, বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি এবং বড় ধরনের সরকারি কেনাকাটার কারণে ব্যয়ের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারের আয় বাড়ছে না। ফলে সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হবে এমন খাতে, যেখান থেকে সরকারের সরাসরি কোনো আয় আসে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং ভর্তুকি ও প্রণোদনার মতো খাতেই বাজেটের বড় অংশ চলে যাচ্ছে।
অর্থাৎ, সারা বছরে সরকারের যে ব্যয় হবে, তার প্রায় অর্ধেকই ব্যয় করতে হবে বেতন-ভাতা দেওয়া, ঋণের দায় পরিশোধ এবং বিভিন্ন ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায়।
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। নতুন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। যদিও চলতি অর্থবছরে চার ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তারপরও আগামী বছরগুলোতে সরকারের ওপর এর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সরকারি বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা, যা আগের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি। পাশাপাশি পেনশন ও গ্র্যাচুইটি খাতেও প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যয়ের এই চাপ সামলাতে হলে সরকারের খরচের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের সাধারণ ব্যয়ের সঙ্গে জ্বালানি খাতের অতিরিক্ত চাপ যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো, ঋণের দায় এবং অতীতের বিভিন্ন সমস্যার প্রভাবও অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে। তার মতে, বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থ ব্যবস্থাপনা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
জ্বালানি খাতেও সরকারের ব্যয় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে ভর্তুকির চাপও রয়েছে।
এলএনজি আমদানিতেও দেখা দিয়েছে চাপ। গত জুলাই-আগস্ট সময়ে ১৫টি এলএনজি কার্গো দেশে এসেছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে এসেছিল ২১টি। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বেড়েছে। কিছুদিন আগেও প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ২২ থেকে ২৪ ডলার থাকলেও তা বেড়ে প্রায় ২৮ ডলারে উঠেছে।
জ্বালানি ছাড়াও কৃষি খাতে সার ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। দেশে বছরে প্রায় ৬৭ লাখ টন সারের প্রয়োজন হয়, যার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণে সার আমদানির খরচ বেড়েছে।
এসব ব্যয় সামলাতে সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও বাজেট সহায়তা নিয়েছে। সার আমদানির জন্য ৩০ কোটি ডলার এবং জ্বালানি পণ্য আমদানির জন্য আরও ৭১ কোটি ডলারের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল, গ্যাস ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত প্রায় ২৮০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হতে পারে, যা বর্তমান বিনিময় হারে ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এদিকে সরকার বিভিন্ন নতুন কর্মসূচিও হাতে নিয়েছে, যা ব্যয়ের চাপ আরও বাড়াচ্ছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি। চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। চার বছরে এই সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের ঋণ সুবিধা, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির জন্যও বাড়তি অর্থ প্রয়োজন হবে।
সরকারের বড় ব্যয়ের আরেকটি খাত হলো উড়োজাহাজ কেনা। যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দফায় ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে, যার ব্যয় প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার বা ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০৩৭ সালের মধ্যে এসব উড়োজাহাজ দেশে আসবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এর অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশকে বিদেশি ঋণের কিস্তি হিসেবে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গত ১৪ বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় চার গুণ বেড়েছে।
দেশীয় ঋণের ক্ষেত্রেও সরকারের ব্যয় বাড়ছে। ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।
এদিকে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব আয় বাড়ানো। চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন প্রায় ৪৫ শতাংশ।
তবে অতীতে এনবিআর কখনো এত বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে, যা ছিল মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ। গত অর্থবছরেও এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
রাজস্ব আয় বাড়াতে সরকার কর ব্যবস্থার সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণ এবং অটোমেশন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কর ব্যবস্থা বিস্তৃত করা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশের কাছাকাছি, যা বিশ্বের তুলনায় অন্যতম কম।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণে ব্যয় বাড়লেও অর্থায়ন নিয়ে এখনই উদ্বেগের কারণ নেই।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, সার মূল্য বৃদ্ধি এবং নতুন সামাজিক কর্মসূচির কারণে ব্যয় বাড়ছে। তবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কর ফাঁকি, কর পরিহার এবং কর অব্যাহতির বিষয়গুলো পর্যালোচনায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—বাড়তে থাকা ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয় বাড়ানো এবং একই সঙ্গে ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণে রাখা। কার্যকর ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামো ছাড়া ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

