দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে দেশের সিরামিক শিল্প এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানার উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে গেছে, আবার যেসব কারখানা চালু রয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগই স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, নরসিংদী, ময়মনসিংহ ও হবিগঞ্জসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের ৩০টির বেশি সিরামিক, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার কারখানা বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে রয়েছে।
সিরামিক কারখানায় উৎপাদন চালু রাখতে সাধারণত প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ১৫ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত এক মাসের বেশিরভাগ সময় এই চাপ কমে ৩ থেকে ৪ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। অনেক সময় সরবরাহ একেবারে বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে মাত্র ৩৪ থেকে ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে পুরো সিরামিক খাতের উৎপাদন প্রায় ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে এবং স্থানীয় বাজারেও সরবরাহ সংকট তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার কমে যাওয়া বা বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সাধারণ সম্পাদক ইরফান উদ্দিন বলেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে অনেক কারখানা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। স্থানীয় উৎপাদন কমে গেলে দেশের বাজারে আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সিরামিক শিল্পে গ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই খাতের উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ১২ শতাংশ সরাসরি গ্যাসের পেছনে যায়। বিশেষ করে সিরামিক পণ্য পোড়ানোর চুল্লিতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে গেলে চুল্লির ভেতরের পণ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া কোনো চুল্লি একবার বন্ধ হয়ে গেলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পরও সেটি পুনরায় চালু করতে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ শুধু উৎপাদন কমাচ্ছে না, বরং বাড়তি ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে টেবিলওয়্যার রপ্তানি করা আর্টিসান সিরামিকসও এই সংকটের বড় ধাক্কা খেয়েছে। গাজীপুরের এই কারখানার উৎপাদন প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই কারণে রপ্তানিও কমে গেছে এবং বাধ্য হয়ে নতুন অর্ডার নেওয়ার পরিমাণ কমাতে হয়েছে।
তিনি জানান, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের সন্তুষ্ট রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আগামীতে এসব ক্রেতা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্ডার দেবেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে কিছু কারখানা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ করতেও বাধ্য হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গ্রেট ওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের টাইলস কারখানা এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার বর্গমিটার টাইলস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বেশিরভাগ শ্রমিককে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির হবিগঞ্জের স্যানিটারিওয়্যার কারখানাতেও উৎপাদন প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশের অন্যতম বড় সিরামিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরএকে সিরামিকসও গ্যাস সংকটের কারণে তাদের চারটি উৎপাদন ইউনিট টানা আট দিন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমানে একটি ইউনিট চালু হলেও প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ২৫ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে।
গাজীপুরের মীর সিরামিকসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির চারটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে তিনটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন তিন লাখ বর্গফুট টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ৫০ হাজার বর্গফুটে। এতে শত শত শ্রমিকও কাজের বাইরে চলে গেছেন।
নারায়ণগঞ্জের মেঘনা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজও গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক ৫১ হাজার বর্গমিটার টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে টেবিলওয়্যার, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও সিরামিক ইট উৎপাদনের ৭৬টি কারখানা রয়েছে। এই শিল্পে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এবং কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫ লাখ মানুষের।
সিরামিক শিল্পের প্রধান কারখানাগুলো গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, হবিগঞ্জ ও ভোলায় অবস্থিত। তবে ভোলা ও হবিগঞ্জের কিছু কারখানা তুলনামূলক ভালো গ্যাস সরবরাহ পেলেও দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান সংকটে রয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু উৎপাদন নয়, পুরো শিল্প খাত এবং কর্মসংস্থানেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিসিএমইএ সভাপতি মইনুল ইসলাম জানান, গ্যাস সংকট সমাধানে শিল্প মালিকরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তিনি বলেন, প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ও লাখো মানুষের কর্মসংস্থান থাকা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের নির্মাণ খাত ও রপ্তানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সিরামিক শিল্পকে রক্ষা করতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

