দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার একদিকে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে নতুন অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি গ্যাস সংকটের মূল কারণ সমাধানের পথে যাচ্ছে, নাকি শুধু জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াচ্ছে?
দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ এখন আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে পূরণ হচ্ছে। কিন্তু দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ক্রমেই কমছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু দেশীয় উৎপাদন সেই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি পর্যন্ত ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। মহেশখালীর একটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং সাধারণ গ্রাহকদের ওপর।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
গত ১২ আগস্ট সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি এই প্রস্তাব অনুমোদন করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের গ্যাস আমদানি করবে বাংলাদেশ।
তবে এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। কারণ যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে, সেটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সাধারণত দুই দেশের সরকারের মধ্যে হওয়া চুক্তিকে সরকার-টু-সরকার চুক্তি বলা হয়। ফলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির আইনি ভিত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ১৪টি গ্যাসের চালান সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে নির্দিষ্ট অতিরিক্ত মূল্য যোগ করে।
এরপর ২০২৮ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত আরও ১০৩টি চালান সরবরাহ করা হবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম ওঠানামা করায় দীর্ঘমেয়াদি এই আমদানি চুক্তির খরচ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্রতি একক গ্যাসের দাম অনেক বেশি। একটি গ্যাসের চালান কিনতেই বাংলাদেশকে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় করতে হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, শুধু বিদেশ থেকে গ্যাস এনে সংকট মোকাবিলা করা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো কূপ সংস্কার এবং নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করা দরকার।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমেছে। একই সময়ে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, দেশে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, পুরোনো গ্যাসকূপ পুনরায় চালু করা এবং সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম যখন এখনো ধীরগতিতে চলছে, তখন কেন আমদানির ওপর এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকার অবশ্য বলছে, দেশের বাড়তে থাকা চাহিদা পূরণ করতে গ্যাস আমদানি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি নতুন ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মহেশখালীর কুতুবজম এলাকায় নতুন একটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও অনুমোদন করা হয়েছে। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে দেশের গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
এদিকে সরকার গ্যাস সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো, নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপ সংস্কার করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে গ্যাস আনার সম্ভাবনা যাচাই করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি সাময়িকভাবে সংকট কমাতে পারে, কিন্তু দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎস উন্নয়ন না করলে ভবিষ্যতে বিদেশি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—বাংলাদেশ কি গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথে যাচ্ছে, নাকি সাময়িক সমাধানের জন্য আরও বেশি করে আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?

