স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে সামনে রেখে বেশ কিছু প্যারামিটার নির্ধারণ করেছে সরকার। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই তথ্য জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বাংলাদেশ আগামী ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত। জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা সূচক, পূরণ করে ইতিমধ্যেই এই উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে দেশ। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, এলডিসি গ্রাজুয়েশনকে সামনে রেখে আগামী তিন বছরে বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু প্যারামিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এলডিসি গ্রাজুয়েশনকে সামনে রেখে সরকারকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কোম্পানি আইন সংশোধন সেই বৃহৎ কর্মপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ’।
এলডিসি উত্তরণের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া অনেক কনসেশনাল ঋণের সুযোগ পাবে না। পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। গবেষণায় দেখা গেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের ১৭.৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রণীত শুল্কছাড় সুবিধা হারানোর ফলে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।
এলডিসি উত্তরণের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোম্পানি আইন সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। ১৯৯৪ সালে কোম্পানি আইন প্রণয়নের পর মাত্র দুটি ছোটখাটো সংশোধনী আনা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানি আইনে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্যবসা পরিচালনার ধরন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগের কাঠামো ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটিকে আধুনিক করা জরুরি’। সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সফল মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে এই খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
সরকার আইনটি সংশোধনে তাড়াহুড়ো করতে চায় না। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। খসড়া সংশোধনী পর্যালোচনা করে মতামত দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের ৩০ দিন লাগলে ৩০ দিন নিন, ৬০ দিন লাগলে ৬০ দিন নিন। কারণ এটা বাস্তবায়ন হবেই আপনাদের জন্য। তবে সরকারের আরও অনেক এজেন্ডা রয়েছে বলেও মনে করিয়ে দেন তিনি।
দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কোম্পানি আইন প্রণয়নের পর এর বাস্তব প্রয়োগ করবে বেসরকারি খাত। তাই আইনটি এমনভাবে সংশোধন করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা সহজে, স্বাভাবিকভাবে ও স্বচ্ছন্দে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিভিন্ন সংস্কারের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হবে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে যেসব পরিবর্তন আনা হবে, সেগুলোর প্রতিটিতেই ব্যবসায়ী মহলের পরামর্শ প্রয়োজন হবে। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়েই এসব পরিবর্তন আনতে চায়। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

