বিদেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে এই অর্থ দেশে পাঠাতে খরচের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ অন্যতম বেশি।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) প্রকাশিত সর্বশেষ বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় খরচ প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশে থাকা একজন কর্মী দেশে টাকা পাঠালে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ লেনদেন খরচ হিসেবে চলে যায়।
প্রতিবেদনটিতে বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের রেমিট্যান্স খরচ সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশের একটি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠান। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের যেসব দেশের রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ সবচেয়ে বেশি, তাদের অর্ধেকই স্বল্পোন্নত দেশ। এলডিসি দেশগুলোর মধ্যে বেনিন ও অ্যাঙ্গোলায় রেমিট্যান্স খরচ সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে লাওস ও হাইতিতে এই খরচ তুলনামূলক কম।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে আফ্রিকার কিছু দেশে রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। মোবাইল অর্থ লেনদেনের ব্যবহার বাড়ায় অনেক অঞ্চলে আন্তর্জাতিক অর্থ পাঠানোর খরচ কমেছে।
আঙ্কটাড জানায়, সাব-সাহারা আফ্রিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মোবাইল অর্থ ব্যবহারের হার ২০২১ সালের প্রায় ২৭ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার আন্তঃদেশীয় অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাও সীমান্তপারের অর্থ স্থানান্তরের খরচ কমাতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে ডিজিটালভাবে সরবরাহযোগ্য সেবা বাণিজ্যের দ্রুত বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে এই খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও স্বল্পোন্নত দেশগুলো সেই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না।
গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী সেবা রপ্তানি বছরে গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে।
ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ডিজিটাল সেবা বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মোট সেবা রপ্তানির প্রায় ৫৬ শতাংশই ডিজিটালভাবে সরবরাহযোগ্য সেবা।
তবে এলডিসি দেশগুলো এই প্রবৃদ্ধির সুফল তুলনামূলকভাবে কম পাচ্ছে। গত এক দশকে এসব দেশের সেবা রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। ২০১০ সালে বিশ্ব সেবা রপ্তানিতে এলডিসি দেশগুলোর অংশীদারত্ব ১ শতাংশের নিচে ছিল, যা ২০২৫ সালে আরও কমে ০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
উন্নত দেশগুলোতে মোট সেবা রপ্তানির বড় অংশ ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে আসে। সেখানে উন্নত অর্থনীতিতে ডিজিটাল সেবার অংশ প্রায় ৬১ শতাংশ হলেও এলডিসি দেশগুলোতে তা মাত্র ১৬ শতাংশ।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিভিন্ন খাতে সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পরিবহন, অর্থায়ন, নকশা, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি সেবা এখন প্রায় সব ধরনের পণ্য উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মধ্যবর্তী উৎপাদন উপকরণের ৭১ শতাংশের সঙ্গে কোনো না কোনো সেবা যুক্ত ছিল। উন্নত দেশগুলোতে এই হার ৭৮ শতাংশ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ৬১ শতাংশ।
অন্যদিকে এলডিসি দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৫৮ শতাংশ।
পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও সেবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী শিল্পপণ্য রপ্তানিতে ব্যবহৃত মধ্যবর্তী উপকরণের প্রায় ৩৩ শতাংশ সেবা খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এলডিসি দেশগুলোতে এই হার মাত্র ১৩ শতাংশ।
আঙ্কটাড বলেছে, সেবাকে শুধু একটি আলাদা খাত হিসেবে দেখলে হবে না। পণ্য উৎপাদন, রপ্তানি সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
আঙ্কটাড সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ ভবিষ্যতে দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান আরও বাড়াতে পারে। কারণ উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতা, তথ্য, অর্থায়ন ও দক্ষ জনবল এখনো কিছু নির্দিষ্ট দেশের হাতে বেশি কেন্দ্রীভূত।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তাই শুধু রেমিট্যান্স খরচ কমানো নয়, বরং ডিজিটাল সেবা, প্রযুক্তি দক্ষতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

