বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন একটি সমুদ্রভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে নোভাটেক মিডল ইস্ট। প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের তুলনায় কম খরচে এবং দীর্ঘস্থায়ী একটি বিকল্প হিসেবে এই প্রকল্পের ধারণা উপস্থাপন করেছে।
নোভাটেকের প্রস্তাবিত প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ডলার। এটি হবে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রের তলদেশে স্থাপিত একটি স্থায়ী টার্মিনাল, যেখানে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের ব্যবস্থা থাকবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এই টার্মিনালের গ্যাস পুনরায় সরবরাহের সক্ষমতা হবে বছরে ৭৫ লাখ টন। নোভাটেক সম্প্রতি পেট্রোবাংলার কাছে এই ধারণা উপস্থাপন করেছে।
নোভাটেকের দাবি, একই সক্ষমতার একটি প্রচলিত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে যেখানে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে, সেখানে সমুদ্রভিত্তিক এই স্থাপনা নির্মাণে খরচ হবে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয়ে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার বা ২১ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।
তবে এই হিসাব এখনো নোভাটেকের নিজস্ব মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। সরকারের কোনো স্বাধীন যাচাই বা মাতারবাড়ীতে পরিকল্পিত এলএনজি টার্মিনালের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সঙ্গে এখনো এর তুলনা করা হয়নি।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের একটি উপস্থাপনা। বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
প্রস্তাবিত এই স্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি উপকূলের পরিবর্তে সমুদ্রের গভীরে স্থাপন করা হবে। সাধারণ স্থলভিত্তিক টার্মিনালে উপকূলীয় এলাকায় গ্যাস সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা থাকে। অন্যদিকে নোভাটেকের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় শক্তিশালী কংক্রিটের তৈরি একটি কাঠামো সমুদ্রের তলদেশে স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হবে।
এই স্থাপনায় এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তরের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সমুদ্রের নিচ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।
নোভাটেক জানিয়েছে, মহেশখালী ও মাতারবাড়ীর আশপাশের গভীর সমুদ্র এলাকা এই প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রভিত্তিক এই টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগতে পারে ৩০ থেকে ৩৬ মাস। এর নকশাগত স্থায়িত্ব হতে পারে ৬০ থেকে ৮০ বছর। অন্যদিকে প্রচলিত স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় ৪৮ থেকে ৬০ মাস সময় লাগতে পারে এবং এর স্থায়িত্ব সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ বছর।
বর্তমানে বাংলাদেশ মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গ্যাস আমদানি করছে। পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পও আবার সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমছে এবং আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন এলএনজি অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
সম্প্রতি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোতে কারিগরি সমস্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প খাতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। নোভাটেকের দাবি, সমুদ্রের তলদেশে স্থায়ী এই কাঠামো ঝড় ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি দুটি ধরনের নকশার প্রস্তাব দিয়েছে। বড় কাঠামোটিতে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ঘনমিটার এলএনজি সংরক্ষণ করা যাবে এবং ছোট কাঠামোটিতে ধারণক্ষমতা থাকবে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ঘনমিটার। উভয় ব্যবস্থারই বছরে ৭৫ লাখ টন গ্যাস পুনরায় সরবরাহের সক্ষমতা থাকবে।
এ ছাড়া নোভাটেক ভবিষ্যতে একটি নতুন পরিবহন ব্যবস্থার প্রস্তাবও দিয়েছে। এর মাধ্যমে ছোট আকারের বিশেষ জাহাজে করে সমুদ্রভিত্তিক টার্মিনাল থেকে মেঘনাঘাট, আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল ও ভেড়ামারার মতো নদীতীরবর্তী এলাকায় এলএনজি সরবরাহ করা যাবে।
প্রতিষ্ঠানটি এই ব্যবস্থাকে “ভার্চুয়াল পাইপলাইন” হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর মাধ্যমে দেশের যেসব এলাকায় সরাসরি গ্যাস পাইপলাইন নেই, সেসব এলাকাতেও গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
নোভাটেক আরও মনে করছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এই টার্মিনালকে আঞ্চলিক এলএনজি পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশেও ছোট ও মাঝারি আকারের জাহাজের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
তবে প্রকল্পটির অর্থায়ন কাঠামো, বিনিয়োগ পদ্ধতি, সেবা মূল্য এবং বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য লাভ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার মধ্যে নোভাটেকের এই প্রস্তাব নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। তবে বাস্তবায়নের আগে প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিস্তারিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

