দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মৎস্য খাতে উৎপাদন বাড়লেও কমছে প্রবৃদ্ধির হার। গত কয়েক বছরে মোট মাছ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে আসছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করে মৎস্য খাত। দেশের লাখ লাখ মানুষের জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্য ব্যবস্থার সঙ্গে এই খাত সরাসরি যুক্ত। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত হারে এগোচ্ছে না খাতটির প্রবৃদ্ধি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ১১ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু এ সময়ে মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন বাড়ার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং এই খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষি পরিসংখ্যানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে দেশের মোট মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও চাষভিত্তিক উৎপাদন। তবে এর বিপরীতে সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন কমছে এবং সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধির হারও নিম্নমুখী হচ্ছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছিল ৪৬ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উৎপাদন হয়েছিল ৩৯ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন এবং সামুদ্রিক উৎস থেকে এসেছিল ৬ লাখ ৮১ হাজার মেট্রিক টন। ওই সময়ে মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৬২ শতাংশ।
পরবর্তী দুই অর্থবছরে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়ে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট উৎপাদন বেড়ে হয় ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৪৯ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টনে। এ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার যথাক্রমে ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও ৩ দশমিক ২৮ শতাংশে পৌঁছায়।
তবে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো মাছ উৎপাদন ৫০ লাখ টনের সীমা অতিক্রম করে ৫০ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছায়। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেড়ে ৫১ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। কিন্তু একই সময়ে প্রবৃদ্ধির হার কমে যথাক্রমে ২ দশমিক ১১ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে আসে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান কারণ হচ্ছে চাষভিত্তিক মাছ উৎপাদনের সম্প্রসারণ। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের পোনা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক মাছ চাষের কারণে উৎপাদন বেড়েছে।
তবে এর সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন খরচও। মাছের খাদ্য, পোনা, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও শ্রমের দাম বাড়ায় অনেক চাষি আগের মতো উৎপাদন বাড়াতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে কমছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও মৎস্য খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং লবণাক্ততার বিস্তার মাছের প্রজনন ও চাষ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একই সঙ্গে নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় কমে যাওয়ায় দেশীয় মাছের উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে অনেক মাছের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব বলেন, সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মাছ আহরণ। তিনি বলেন, মাছ আহরণের চাপ কমানোর পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে নতুন মাছের উৎস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের মাছ ধরার কার্যক্রম মূলত সীমিত গভীরতার মধ্যেই পরিচালিত হয়। গভীর সমুদ্রের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের জন্য পরিবেশ দূষণ একটি বড় সমস্যা। বিভিন্ন ধরনের দূষণের কারণে মাছের আবাসস্থল ও খাদ্যচক্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৎস্য খাতকে এগিয়ে নিতে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিলে হবে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, চাষের খরচ কমানো, মানসম্মত পোনা ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অভ্যন্তরীণ) ড. মো. মোতালেব হোসেন জানান, মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং নতুন কিছু প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে মৎস্য খাতের গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনের বর্তমান ধারা ধরে রেখে প্রবৃদ্ধির গতি আবার বাড়ানো।

