দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তারা নতুন কারখানা স্থাপনে যে টাকা বিনিয়োগ করছেন, তার প্রায় ৮০ শতাংশই খরচ হচ্ছে জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য সিভিল কাজে। অথচ আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সরঞ্জামে বিনিয়োগ হচ্ছে মাত্র ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই বিনিয়োগ কাঠামো উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা, তিনটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের অংশ ১৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, আর সরকারি খাতের অংশ ৩ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা।
তবে এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের গঠন দেখলে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত বৈষম্য। নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোটের ৮৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অথচ শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোটের মাত্র ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা বিনিয়োগের মধ্যে ৮৪ টাকাই চলে যাচ্ছে জমি-নির্মাণে, আর উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে পড়ছে মাত্র ৮ টাকা। পরিবহন সরঞ্জামে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে।
এই প্রবণতা কিন্তু নতুন নয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নির্মাণ খাতের অংশ ছিল মোটের ৭২ দশমিক ১৭ শতাংশ, আর যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ, গত আট বছরে নির্মাণের অংশ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ পয়েন্ট, অন্যদিকে যন্ত্রপাতির অংশ কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্ট। বেসরকারি বিনিয়োগ এখনও জিডিপির ২৩-২৫ শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু শুধু বিনিয়োগের হার বাড়ালেই হবে না, বিনিয়োগের মান ও গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলছেন, ‘প্রশ্ন হলো, আমরা কেন অবকাঠামোর বাইরেও আবাসন ও বাণিজ্যিক নির্মাণে এত বেশি ঝুঁকছি? এর পেছনে দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ দায়ী হতে পারে। শিল্প বা উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে সময় ও লেনদেন খরচ বেশি। আর জমি, ফ্ল্যাট বা ভবনে টাকা রাখা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে হয়, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির সময়ে এসব সম্পদ ‘মূল্যের ভাণ্ডার’ হিসেবে কাজ করে’।
পূর্ব কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীর মতে, উৎপাদনমুখী খাত পিছিয়ে পড়ছে প্রযুক্তির অনুপযুক্ত ব্যবহার, উচ্চ নির্মাণ ব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং অস্বাভাবিক জমির দামের কারণে। রড ও ইস্পাতের দাম বাড়ায় নির্মাণ খরচ বহুগুণ বেড়েছে। অন্যদিকে সিমেন্ট খাতে চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, ফলে কোম্পানিগুলো টিকতে লোকসানে বিক্রি করছে। জমির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় শিল্প বিনিয়োগকারীরা চরম প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। ডলারের দাম বৃদ্ধি ও এলসি খুলতে জটিলতা নতুন বিনিয়োগকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকঋণের ৪৪ শতাংশ বা ৭ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি শিল্প খাতে গেছে। অথচ গত আড়াই বছরে পুঁজিবাজারে একটি আইপিওও হয়নি। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, শিল্প উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ব্যাংকগুলো যখন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের চেয়ে জামানতের মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন উদ্যোক্তাদের জমি-ভবনে বিনিয়োগ করার প্রবণতা বাড়ে। আর এটাই পরবর্তীতে খেলাপি ঋণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অ্যানোনটেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, সাদ মুসা গ্রুপ, এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে জমি-ভবনে বিনিয়োগ করেছিল, কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তারা খেলাপি হয়েছে। ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন বলেছেন, ‘স্থায়ী মূলধনের বিশাল অংশ নির্মাণে চলে যাওয়া উদ্বেগজনক। এতে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে’।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগের এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। প্রথমত, জমি অধিগ্রহণ ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করে সেখানে আইপিওর মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধান করতে হবে। পঞ্চমত, প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক减免 ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বিনিয়োগ কাঠামো যদি এভাবেই জমি-নির্মাণকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়বে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, আর রপ্তানি আয়ও বাড়বে না। সময় এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার—‘সম্পদ আহরণ’ না ‘উৎপাদন সম্প্রসারণ’ কোন পথে এগোতে চায় বাংলাদেশ।

