বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর গড়ে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার টাকার সরকারি ঋণের হিসাব সামনে এসেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশের মাথাপিছু সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা, যা প্রায় ১ হাজার ৮০ মার্কিন ডলারের সমান।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে এই টাকা পরিশোধ করতে হবে। এটি মূলত দেশের মোট সরকারি ঋণকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া একটি হিসাব। অর্থাৎ এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক আর্থিক দায়, যা জনগণের হয়ে সরকার বহন করছে।
সরকার যখন বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বাজেট ঘাটতি পূরণ, বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি মোকাবিলা বা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়, তখন সেই ঋণের দায় পরিশোধ করতে হয় সরকারি রাজস্ব থেকে। আর এই রাজস্বের বড় অংশ আসে কর ও অন্যান্য সরকারি আয়ের মাধ্যমে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ নেওয়া নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নেওয়া ঋণ অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ঋণ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনা নিয়েই মূল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ দেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সীমার নিচে থাকলেও ঋণ নেওয়ার গতি দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মাথাপিছু সরকারি ঋণ ছিল প্রায় ৯৫ হাজার টাকা, যা ২০২৪ সালের শুরুতে বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার টাকায় পৌঁছায়। এরপর ২০২৬ সালের মার্চে তা ১ লাখ ২৯ হাজার টাকার বেশি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় উদ্বেগ হলো বাংলাদেশের কম কর আদায়ের সক্ষমতা। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নিম্ন অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের আয় বাড়ানোর সক্ষমতা সীমিত থাকায় ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরসহ অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাই বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ। কর আদায় বাড়াতে না পারলে ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, যদি উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া হয় এবং সেই অর্থ এমন প্রকল্পে ব্যয় করা হয় যেগুলো থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক লাভ আসে না, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের মতো বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক সংস্কার ও ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হলে ঋণের অর্থের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋণ এখনো খুব বেশি নয়। দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ৩ হাজার ডলারের বেশি হওয়ায় ১ হাজার ৮০ ডলারের মাথাপিছু ঋণকে অনেক অর্থনীতিবিদ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে করছেন। তবে ভবিষ্যতে ঋণের ব্যবহার ও পরিশোধ সক্ষমতাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সরকার বর্তমানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সীমিত করা এবং সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের মাধ্যমে আর্থিক ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে সাধারণ মানুষের জীবনে সরকারি ঋণের প্রভাব কীভাবে পড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারকে বাড়তি রাজস্ব সংগ্রহ করতে হয়। এর ফলে অনেক সময় ভ্যাটসহ পরোক্ষ কর বাড়ানোর প্রয়োজন হয়, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ তৈরি করে।
অতিরিক্ত দেশীয় ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি সরকারি বাজেটের বড় অংশ যদি ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যেতে পারে।
তবে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু ১ লাখ ২৯ হাজার টাকার এই সংখ্যার ওপর নির্ভর করছে না। মূল বিষয় হলো এই ঋণ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
যদি ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়, কর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যায় এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে এই ঋণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু যদি রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে বারবার ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয় এবং অর্থনৈতিক সংস্কার পিছিয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের নীতি নির্ধারণের সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।
তাই মাথাপিছু ১ লাখ ২৯ হাজার টাকার ঋণকে শুধু ভয় পাওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, বরং দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হচ্ছে—তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

