পাহাড়ের ঢালে এককানি জুম চাষে কৃষকের খরচ হয় আনুমানিক ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকা। জঙ্গল কাটা, জমি পরিষ্কার ও পোড়ানো, বীজ বপন, নিড়ানিসহ প্রাথমিক চাষাবাদের পেছনে যায় এই অর্থ। এরপর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একই জমি থেকে পাওয়া যায় ধান, ভুট্টা, মরিচ, মারফাসহ নানা ফসল। শুধু এই চারটি ফসলের আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে ৩১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় তিল, তুলা, মিষ্টি কুমড়া, আদা-হলুদের মতো অন্যান্য ফসল। ফলে দুর্গম পাহাড়ে জুম এখন শুধু প্রজন্মের পর প্রজন্মের কৃষি ঐতিহ্য নয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও নগদ আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়িসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি জনপদে এখন জুমের মাঠ ঘিরে ব্যস্ততা। কোথাও ধানের শিষে সোনালি আভা, কোথাও সারি সারি ভুট্টা, মরিচ, মারফা, হলুদ, আদা, কচু, মিষ্টি কুমড়া ও তিলের গাছ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জুমের ক্ষেতে কাজ করছেন কৃষক পরিবারের সদস্যরা। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ ফসল সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জুমের অর্থনীতির বিশেষত্ব হলো, একই জমিতে একসঙ্গে বিভিন্ন ফসল চাষ করা যায়। ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, মরিচ, মারফা, তিল, কুমড়া, হলুদ, আদা কিংবা কলা চাষ করেন কৃষকেরা। এতে একদিকে পরিবারের খাদ্যের জোগান আসে, অন্যদিকে বাড়তি ফসল বিক্রি করে পাওয়া যায় নগদ অর্থ। ফলে একটি জুমক্ষেত একই সঙ্গে পরিবারের খাদ্য ব্যয় কমায় এবং আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।
প্রতি কানি জুমে জঙ্গল কাটা, পোড়ানো, বীজ রোপণ ও নিড়ানি বাবদ আনুমানিক ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়। পাহাড়ের ঢাল, জমির অবস্থান এবং শ্রমিকের সহজলভ্যতার ওপর এই ব্যয় কম-বেশি হতে পারে। অর্থাৎ চাষের শুরুতেই কৃষককে একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। অনেক পরিবারকে সেই অর্থ জোগাড় করতে হয় নিজেদের গৃহপালিত পশু-পাখি কিংবা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে।
জুমচাষি বনরঞ্জন ত্রিপুরার অভিজ্ঞতাও একই। এ বছর এক কানি জমিতে জুম করেছেন তিনি। ধানের পাশাপাশি চাষ করেছেন ভুট্টা, মারফা ও মরিচ। জুমের খরচ জোগাতে মুরগি ও শুকর বিক্রি করেছেন। বনরঞ্জন ত্রিপুরা বলেন, ‘মুরগি ও শুকর বিক্রি করে জুম চাষের অর্থ জোগাড় করি। নিজ অর্থায়নেই সব করতে হয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে আমরা আরও ভালোভাবে জুম চাষ করতে পারতাম।’ আবহাওয়া ভালো থাকলে এক কানি জুম থেকে আনুমানিক ৭ থেকে ১০ মণ ধান, ২ থেকে ৩ মণ ভুট্টা, ৬০ থেকে ৮০ কেজি পাহাড়ি কাঁচামরিচ এবং ১৫০ থেকে ২০০ কেজি মারফা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কিছু পরিমাণ তিল, তুলা, মিষ্টি কুমড়া, আদা ও হলুদও উৎপাদিত হয়।
স্থানীয় বাজারদর ধরে হিসাব করলে, ৭ থেকে ১০ মণ জুমের ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার ৪০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ২ থেকে ৩ মণ ভুট্টা ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলে পাওয়া যেতে পারে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা। ৬০ থেকে ৮০ কেজি মরিচ কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হলে মূল্য দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮০০ থেকে ১২ হাজার টাকা। আর ১৫০ থেকে ২০০ কেজি মারফা ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলে এর বাজারমূল্য হতে পারে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা।
অর্থাৎ ধান, ভুট্টা, মরিচ ও মারফা—এই চারটি ফসলের সম্ভাব্য মোট বাজারমূল্য আনুমানিক ৩১ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে তিল, তুলা, মিষ্টি কুমড়া, আদা ও হলুদের মূল্য যোগ হয়নি। তবে এই হিসাবকে নিট লাভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; পরিবারের নিজস্ব শ্রম, পরিবহন, বাজারজাতকরণসহ অন্যান্য ব্যয় আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
জুমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখানেই। একটি পরিবারের জন্য উৎপাদিত ধান ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের একটি অংশ সরাসরি খাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হওয়ায় বাজার থেকে সেই পরিমাণ খাদ্য কেনার প্রয়োজন কমে। আবার উদ্বৃত্ত ফসল বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে সংসারের অন্যান্য খরচ মেটানো যায়। ফলে জুমের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু বিক্রিত ফসলের দামে নয়, পরিবারের সাশ্রয় হওয়া খাদ্য ব্যয়ের মধ্যেও রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনার বিপরীতে ঝুঁকিও কম নয়। জুম সম্পূর্ণ বা প্রধানত প্রকৃতিনির্ভর হওয়ায় অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েক মাসের শ্রম ও বিনিয়োগ একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এবারের অতিবৃষ্টিতেও কোথাও কোথাও ফসল নষ্ট হয়েছে।
জুমচাষি চাইনি ত্রিপুরা এবার ধানের পাশাপাশি ভুট্টা ও কলা চাষ করেছেন। কিন্তু অতিবৃষ্টিতে তার ক্ষেতেও কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে আমরা জুম চাষ করি। ফসল বিক্রি করে পরিবারের খরচ মেটাই। এবার ধানের পাশাপাশি ভুট্টা ও কলা চাষ করেছি। তবে অতিবৃষ্টিতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাইনি।’
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বাজারজাতকরণ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে ফসল বাজারে নিতে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটিই লাগে। ফলে মাঠে ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকের প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল মরিচ ও মারফার ক্ষেত্রে দ্রুত বাজারজাতকরণ গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদক থেকে ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা, পরিবহন ব্যয় ও স্থানীয় বাজারদর—সবই কৃষকের হাতে থাকা অর্থের পরিমাণে প্রভাব ফেলে।
চাষিদের ভাষ্য, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সে তুলনায় সরকারি সহায়তা সীমিত। মানসম্মত বীজ, কৃষি উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা পেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ফসল সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারসংযোগের সুযোগ তৈরি করা গেলে বাড়তে পারে জুমচাষির আয়।
কৃষি বিভাগের দাবি, জুমচাষিদের পাশে রয়েছে তারা। দীঘিনালা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমন বলেন, ‘এ বছর ২৮০ হেক্টর জমিতে জুম চাষ করা হয়েছে। আমরা নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নিচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিচ্ছি। জুমচাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
জুমের সঙ্গে পাহাড়ের মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও বহু বছরের ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখন নতুন করে দেখার সময় এসেছে। কারণ জুমের উৎপাদন কমে গেলে শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; কমে যেতে পারে একটি পরিবারের খাদ্যের জোগান ও নগদ আয়ের সুযোগও।
তাই জুমকে শুধু ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ নয়, এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরামর্শ, ফসল সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা এবং কৃষককে ন্যায্য বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে জুম আরও লাভজনক হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে টেকসই জুমচাষের পরিকল্পনাও জরুরি।
পাহাড়ের ঢালে তাই জুমের সবুজ ক্ষেত শুধু ঐতিহ্যের ছবি নয়; এটি বিনিয়োগ, উৎপাদন, খাদ্য, বাজার ও আয়ের এক বাস্তব অর্থনীতি। ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকা খরচ করে কয়েক মাসের শ্রমে ফলানো ফসল দিয়ে কোনো পরিবার ঘরের খাবার জোগায়, কোনো পরিবার পায় নগদ আয়। প্রকৃতির ঝুঁকি আর বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও সেই অর্থনীতির ওপর ভর করেই টিকে আছে পাহাড়ের বহু পরিবার। জুম তাই পাহাড়ের মানুষের কাছে শুধু কৃষি নয়—জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

