চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে নতুন এক মাইলফলক স্থাপিত হয়েছে। সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় পোর্ট অপারেটর রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) বাংলাদেশ জানিয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ ফরাসি শিপিং জায়ান্ট সিএমএ সিজিএমের জাহাজ এমভি ওয়ানেন হ্যান্ডলিংয়ের সময় তারা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫৮টি কন্টেইনার মুভ এবং ৮২ টিইইউ (টোয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) পরিচালনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যে, এটি বাংলাদেশের বন্দর খাতের জন্য একটি নতুন উৎপাদনশীলতার বেঞ্চমার্ক। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে ঐতিহাসিকভাবে কন্টেইনার জাহাজগুলো ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৩০টি মুভ বা ৪৮ টিইইউ হ্যান্ডলিং করত। অর্থাৎ নতুন অর্জনটি প্রায় দ্বিগুণ। এই সাফল্য এসেছে টার্মিনালটির প্রথম ‘গিয়ারলেস ভেসেল অপারেশনে’ যেখানে জাহাজে কোনো ক্রেন না থাকায় সম্পূর্ণভাবে তীরভিত্তিক (শোর-বেসড) ক্রেন ব্যবহার করে পণ্য ওঠানামা করা হয়। এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সদ্য চালু হওয়া শিপ-টু-শোর (এসটিএস) ক্রেন।
এই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে নতুন এসটিএস ক্রেনগুলো। চলতি বছরের জুন মাসে প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে চীনের স্যানি মেরিন হেভি ইন্ডাস্ট্রির তৈরি চারটি অত্যাধুনিক ক্রেন পতেঙ্গা টার্মিনালে এসে পৌঁছায়। প্রতিটি ক্রেন একক কন্টেইনার অপারেশনে ৪০ টন, টুইন-লিফট মোডে ৪৫ টন এবং বিশেষায়িত কার্গোতে ৬০ টন পর্যন্ত ওজন উত্তোলন করতে সক্ষম। এগুলো সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় সরাসরি কার্বন নিঃসরণ শূন্য। জাহাজে ক্রেনযুক্ত ‘গিয়ারড ভেসেল’-এর বিপরীতে ‘গিয়ারলেস ভেসেল’ বা ক্রেনবিহীন জাহাজের পণ্য ওঠানামার জন্য সম্পূর্ণভাবে তীরভিত্তিক ক্রেনের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে এই নতুন ক্রেনগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে বড় আকারের কন্টেইনার জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই চারটি ক্রেনের মাধ্যমে একইসঙ্গে দুটি জাহাজে (প্রতিটিতে দুটি ক্রেন) কাজ করা সম্ভব হচ্ছে।
আরএসজিটি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরভিন হাজে এই অর্জনকে শুধু উৎপাদনশীলতার সাফল্য বলে মনে করছেন না। তিনি বলেছেন, ‘এটি বাংলাদেশে আধুনিক বন্দর পরিচালনার সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।’ তাঁর মতে, এই মাইলফলক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সুশৃঙ্খল পরিচালনা এবং দক্ষ কর্মশক্তির সমন্বয়ের ফল। আরএসজিটি জানিয়েছে, উচ্চতর এই উৎপাদনশীলতা জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমাতে, বার্থ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে এবং জাহাজ-সংশ্লিষ্ট খরচ কমাতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি এটি দেশের সামুদ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সামগ্রিক দক্ষতা বাড়াবে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এই অর্জন পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালকে আরও দক্ষ ও বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত একটি সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, পরিচালনা পদ্ধতি এবং কর্মশক্তির উন্নয়নে বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল বাংলাদেশের প্রথম বিদেশি কোম্পানি পরিচালিত কন্টেইনার টার্মিনাল। ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২২ বছরের চুক্তির অধীনে আরএসজিটি এই টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব পায় এবং ২০২৪ সালের জুন থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। এর আগে ২০১৭ সালে গৃহীত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) নীতির আওতায় এটি ছিল প্রথম বেসরকারি বন্দর পরিচালনা চুক্তি। আরএসজিটি ইতিমধ্যেই টার্মিনালটির আধুনিকায়নে ১৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে ৩০ মিলিয়ন ডলারের চারটি এসটিএস ক্রেন, ২৬ মিলিয়ন ডলারের ১৪টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি) ক্রেন এবং প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলারের একটি কন্টেইনার স্ক্যানার। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিক খাতে আরও ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
এই অর্জনের তাৎপর্য ব্যাপক। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিচালনা করে। ২০২৫ সালে বন্দরটি প্রায় ৩৪ লাখ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। পতেঙ্গা টার্মিনালে ২০২৫ সালে মাত্র ১৫৪,৫৬৪ টিইইউ কন্টেইনার এবং ৭৮টি জাহাজ পরিচালিত হয়, যা টার্মিনালটির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টিইইউ-এর তুলনায় অনেক কম ছিল। কারণ প্রথমদিকে আমদানি কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্যানার না থাকায় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে আরএসজিটি নিজ খরচে স্ক্যানার স্থাপন করলে আমদানি কন্টেইনার পরিচালনা শুরু হয় এবং থ্রুপুট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। নতুন এসটিএস ক্রেন চালু হওয়ার পর টার্মিনালটির বার্ষিক সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ৬ লাখ টিইইউতে উন্নীত হয়েছে। চলতি বছরেই ৪ লাখ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অর্জন চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

