ওমানভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্টার ড্রোনস (মডার্ন স্টার বিজনেসেস এলএলসি) তাদের ফুড ডেলিভারি অ্যাপ ‘বিস’-এর বহরের জন্য বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রিক বাইক (ইভি) কিনবে। শুধু বাইক কেনা নয়, প্রযুক্তি বিনিময়, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ভবিষ্যতে ওমানে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে এই চুক্তিতে। গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকার নভোথিয়েটারে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর অনুষ্ঠানস্থলে বাংলাদেশের পিটন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ওমানের স্টার ড্রোনসের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনের উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পিটন ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ ইকবাল জাহেদী এবং স্টার ড্রোনসের পক্ষে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদ আব্দুল গাফুর সাইফ উদ্দিন চুক্তিতে সই করেন।
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি কেবল একটি সাধারণ রপ্তানি চুক্তি নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ বিনিয়োগের একটি কাঠামো তৈরি করেছে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ইভি প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ওমানে স্থানান্তরিত হবে। পাশাপাশি দুই দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে যৌথভাবে কাজ করা হবে। ওমানি প্রতিষ্ঠানটি তাদের ড্রোন ডেলিভারি প্রযুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশি ইভি বাইকের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি আধুনিক সমন্বিত ডেলিভারি নেটওয়ার্ক তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ডেলিভারি খাতে একটি নতুন মডেল তৈরি হবে, যেখানে ড্রোন ও ইভি বাইক একসঙ্গে কাজ করবে।
প্রাথমিকভাবে ওমানের ফুড ডেলিভারি অ্যাপ ‘বিস’-এর বহরের জন্য বাংলাদেশ থেকে ই-বাইক সংগ্রহ করা হবে। পরবর্তী ধাপে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাড়তে থাকা চাহিদা মেটাতে ওমানে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ওমান শুধু বাংলাদেশের তৈরি পণ্য কিনবে না, বরং বাংলাদেশ থেকে প্রযুক্তি শিখে নিজেরাই উৎপাদন শুরু করবে। চুক্তিতে ওমান থেকে মূলধন ও ড্রোন প্রযুক্তি বাংলাদেশে এনে স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি দ্বিমুখী চুক্তি, বাংলাদেশ ইভি প্রযুক্তি রপ্তানি করবে, আর ওমান ড্রোন প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আনবে।
এই চুক্তির পেছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, তা হলো বাংলাদেশি পণ্যের মান ও উদ্ভাবনের প্রতি ওমানি প্রতিনিধি দলের আস্থা। বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে অংশ নেওয়া ওমানি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশি তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন ও পণ্যের গুণমান দেখে সন্তুষ্ট হয় এবং এরপরই এই বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয়। স্টার ড্রোনসের একজন প্রতিনিধি বলেছেন, ‘এটি শুধু একটি বাইক কেনার চুক্তি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাংলাদেশি প্রযুক্তি বিস্তার এবং বাংলাদেশে ওমানের যৌথ বিনিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা স্মারকটি ছিল দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ইনোভেশন ফেয়ারের একটি বাস্তব ফল। তিনি বলেন, এই ফেয়ার একাডেমিয়া, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের একত্রিত করার একটি উদ্যোগ ছিল, আর পিটন ইন্ডাস্ট্রিজ ও স্টার ড্রোনসের মধ্যে চুক্তিটি সেই সমন্বিত প্রচেষ্টারই ফসল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই প্রযুক্তি চুক্তি জাতীয় অর্থনীতি এবং উদীয়মান গ্রিন টেকনোলজি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই চুক্তি বাংলাদেশের ইভি শিল্পের জন্য একটি বড় মাইলফলক। এর আগে বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, চামড়া ও কৃষিপণ্য রপ্তানি করত। কিন্তু ইভি বাইকের মতো উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য রপ্তানি শুরু হলে তা দেশের রপ্তানি ঝুড়িতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। ওমানে অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপিত হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বাংলাদেশি ইভির বাজার তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিনিয়োগের পথ খুলে দেবে। ওমান দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ও মিনিস্টার প্লেনিপোটেনশিয়ারি ফাথিয়া বিনতে আহমেদ আল বালুশি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এখন দেখার বিষয়, এই চুক্তি কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং ওমানে বাংলাদেশি ইভি বাইকের অ্যাসেম্বলি লাইন কতদিনে চালু হয়।

