উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অথচ আখ চাষ করে আগের মতো লাভ করতে পারছেন না কৃষকেরা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে একটি বিশেষ জাতের আখ। গাঢ় বেগুনি থেকে কালো রঙের এই আখ চাষে তুলনামূলক কম খরচে বেশি ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়ভাবে ‘কালো আখ’ বা ‘ব্ল্যাক রুবি’ নামে পরিচিত ফিলিপাইনের এই জাতটি বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) থেকে বিএসআরআই আখ-৪৯ নামে অনুমোদন পেয়েছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বসুন্ধরা অ্যাগ্রো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (ব্যাসিল) গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করলে এই জাতের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচও তুলনামূলক কম রাখা যায়।
এতে কৃষক, কৃষি গবেষক এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরাসরি খাওয়ার ও আখের রস তৈরির বাজারে জাতটির সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গাজীপুরে আখ চাষের চিত্র
গাজীপুরে দীর্ঘদিন ধরেই আখ চাষ হয়ে আসছে। মাড়াই করে গুড় তৈরির পাশাপাশি সরাসরি খাওয়ার জন্যও এই জেলায় আখের চাহিদা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গাজীপুরে ১ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আখ চাষ হয়েছে কাপাসিয়ায়—১ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে।
এ ছাড়া শ্রীপুরে ১৮৯, গাজীপুর সদরে ১০০, কালীগঞ্জে ৬০ এবং কালিয়াকৈরে ৩৪ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে।
চলতি জাতগুলোর মধ্যে ঈশ্বরদী-১৬ সবচেয়ে বেশি জমিতে চাষ হচ্ছে। এ জাতের আবাদ হয়েছে ৫৪২ হেক্টর জমিতে। সরাসরি খাওয়ার জনপ্রিয় জাতের মধ্যে বিএসআরআই আখ-৪১ বা অমৃত ৩৮৪ হেক্টর, বিএসআরআই আখ-৪২ বা রংবিলাস ৩২৯ হেক্টর এবং বিএসআরআই আখ-৪৭ প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
এই চিত্রে নতুন সংযোজন বিএসআরআই আখ-৪৯। গাঢ় রঙ, নরম কাণ্ড, বেশি রস এবং সহজে চিবিয়ে খাওয়া যায়—এমন বৈশিষ্ট্যের কারণে জাতটি কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের নজর কেড়েছে।
কম দূরত্বে চাষ, দ্বিগুণ ফলনের দাবি
ব্যাসিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কালিয়াকৈরের শাকাশ্বর মধ্যপাড়া এলাকার গবেষণা খামারে ২০ শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কালো আখের চাষ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির কৃষি গবেষণা ও ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই পরীক্ষা চালানো হয়।
মাঠপর্যায়ের গবেষণার দায়িত্বে থাকা ফয়সাল আহমেদ জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত আখের চারা দুই থেকে তিন ফুট দূরত্বে লাগানো হয়। কিন্তু পরীক্ষায় গাছ থেকে গাছের দূরত্ব কমিয়ে ১ থেকে দেড় ফুট করা হয়েছে। তবে সারির মধ্যে দূরত্ব রাখা হয়েছে তিন ফুট।
এভাবে প্রতি বিঘায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার চারা বা কাটিং লাগানো সম্ভব, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গাছের সংখ্যা বাড়ালেও আখের উচ্চতা বা কাণ্ডের পুরুত্বে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং সঠিক পরিচর্যায় ফলন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
আট মাসে আখের উচ্চতা ১০ থেকে ১১ ফুট এবং ১২ মাসে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। প্রতি ১০ থেকে ১৪ দিন পরপর নিচের পুরোনো পাতা সরিয়ে ছয় থেকে আটটি সুস্থ পাতা রেখে দিলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।
একই জমিতে অন্য ফসলও
দোআঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটি এই আখ চাষের জন্য উপযোগী বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরকে চারা লাগানোর ভালো সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আখের সারির মাঝখানে বিভিন্ন সবজি ও স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষ করা যায়। এতে আখের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয় না। পাশাপাশি এই জাতের আখে কীটনাশকের প্রয়োজনও তুলনামূলক কম।
বিএসআরআই গাজীপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. নীলুফার ইসলাম জানান, ‘কালো আখ’ নামে পরিচিত জাতটির সরকারি নাম বিএসআরআই আখ-৪৯। বিএসআরআই এটি উন্নয়ন ও অনুমোদন করেছে।
তিনি বলেন, জাতটি মূলত সরাসরি খাওয়া এবং আখের রস তৈরির জন্য উপযোগী। বাণিজ্যিকভাবে চিনি বা গুড় উৎপাদনের জন্য এটি মূলত উপযুক্ত নয়।
তবে সরাসরি খাওয়ার ক্ষেত্রে জাতটির বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। এর বাইরের আবরণ ও গিঁট তুলনামূলক নরম হওয়ায় সহজে চিবিয়ে খাওয়া যায়। সর্বোচ্চ গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১৭১ টন পর্যন্ত হতে পারে।
গবেষণায় এই আখে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম, দস্তা ও লোহার মতো বিভিন্ন খনিজ উপাদানের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
এক বিঘায় লাখ টাকা লাভের সম্ভাবনা
কালো আখের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। মাঠপর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী, চারা, জমি প্রস্তুত ও পরিচর্যাসহ প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ হতে পারে প্রায় ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা।
প্রতি বিঘায় প্রায় ১৫ থেকে ১৮ টন আখ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারদর অনুযায়ী এর মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ উৎপাদন ও বাজারদরের ওপর নির্ভর করে প্রথম বছরেই একজন কৃষক প্রতি বিঘায় আনুমানিক ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করতে পারেন।
এর আরও একটি সুবিধা হলো, আখ কাটার পর প্রতিটি গোড়া থেকে ১০ থেকে ১৫টি নতুন কুশি বের হতে পারে। ফলে পরের বছর এবং তার পরের বছরও একই জমি থেকে আখ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে নতুন করে জমি প্রস্তুত ও চারা কেনার প্রাথমিক খরচ অনেকটাই কমে যায়।
প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে প্রতি বিঘায় নিট আয় প্রায় ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে প্রকৃত আয় ফলন, পরিচর্যা ও বাজারদরের ওপর নির্ভর করবে।
৪০০ বিঘায় বাণিজ্যিক চাষের পরিকল্পনা
ব্যাসিলের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান এম জেড হোসাইন আরজু জানান, আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করার পর বসুন্ধরা গ্রুপ প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এই আখ চাষের পরিকল্পনা করছে।
পরিকল্পনায় শুধু কাঁচা আখ বিক্রি নয়, আখের রস, উন্নতমানের গুড় এবং কাগজশিল্পের কাঁচামাল তৈরির বিষয়ও রয়েছে। বোতলজাত আখের রস ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
কালিয়াকৈরের সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুরাইয়া সুলতানা ব্যাসিলের গবেষণাক্ষেত্র পরিদর্শন করে নিজেও এই আখ খেয়েছেন। তাঁর মতে, আখটি অত্যন্ত মিষ্টি, নরম ও রসালো। সরাসরি খাওয়ার জন্য এটি খুবই ভালো জাত।
তিনি বলেন, তুলনামূলক কম খরচ ও শ্রমে একই জমি থেকে টানা তিন বছর উৎপাদন করা গেলে তা কৃষকদের আয় বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের চাষাবাদ পদ্ধতি, রোগবালাই ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক চাষ ছড়িয়ে দিতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, মানসম্মত চারা সরবরাহ এবং নির্ভরযোগ্য বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সঠিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বিএসআরআই আখ-৪৯ শুধু নতুন একটি আখের জাত হিসেবেই নয়, কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প ফসল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

