বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ হিসেবে পরিচিত। লাখ লাখ তরুণের স্বপ্ন—মানসম্মত শিক্ষা, সম্মানজনক কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারত। কিন্তু এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বাংলাদেশ কি এই তারুণ্যকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারছে, নাকি অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার আগেই জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে নতুন সংকটের মুখে পড়ছে?
বিশ্বের অনেক দেশ জনসংখ্যাগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উন্নতি করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছে, কীভাবে একটি দেশ বয়স্ক জনসংখ্যার চাপে পড়ার আগেই শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে রয়েছে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ সমৃদ্ধ হওয়ার আগেই যদি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার কমতে শুরু করে, তাহলে উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম বয়সের। গত বছর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ৩৩ লাখ। তবে ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস বলছে, এই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখে নেমে আসতে পারে।
একই সঙ্গে দেশের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি ১০ জন বাংলাদেশির মধ্যে একজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার ১৩ শতাংশের বেশি হতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে এখন একটি সীমিত সময় রয়েছে, যার মধ্যে তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করতে হবে।
তবে শুধু তরুণ মানুষের সংখ্যা বেশি থাকলেই অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায় না। প্রয়োজন তাদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা এবং ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ। বাংলাদেশের বড় সমস্যা এখানেই। উৎপাদনশীলতার দিক থেকে দেশ এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির “বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ২০২৫” প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে শ্রম উৎপাদনশীলতা ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৮ দশমিক ৭ ডলার। যেখানে ভিয়েতনামে এই হার ১২ দশমিক ৪ ডলার, ভারতে ১০ দশমিক ৭ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ১৮ ডলার এবং চীনে ১৯ দশমিক ৮ ডলার।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মসংস্থান এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে। এর অর্থ হলো বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থায়ী নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং উন্নত কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত। জনসংখ্যাগত সুবিধা তখনই বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যখন মানুষ দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়েও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সতর্ক করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচেও চলে যেতে পারে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ২০২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।
যদিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসে পার্থক্য রয়েছে, তবে সবাই একটি বিষয়ে একমত—রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও বড় উদ্বেগের বিষয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উচ্চ হার।
এই পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটি প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি সতর্কবার্তা। কারণ ধীরগতির অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে তরুণদের। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সুযোগের পরিবর্তে চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের নতুন উদ্যোক্তা খাতেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। ২০১০ সাল থেকে দেশের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো ৪৬০টির বেশি বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। তবে এর বড় অংশ এসেছে বিদেশি উৎস থেকে। দেশীয় বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৭৬ মিলিয়ন ডলার।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগের ধারাবাহিকতার অভাব। ২০২১ সালে ৯৪টি চুক্তির মাধ্যমে ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে তা কমে মাত্র ৪১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সমস্যা শুধু অর্থের অভাব নয়, বরং একটি স্থিতিশীল দেশীয় বিনিয়োগ পরিবেশের অভাবও রয়েছে।
২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তা ও নারী উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উদ্যোগের জন্য ৫ বিলিয়ন টাকার তহবিল, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪ বিলিয়ন টাকার বরাদ্দ, অনলাইনভিত্তিক কাজ ও কনটেন্ট তৈরির আয়কে কর সুবিধা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন কর ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু ঘোষণা করলেই হবে না, এসব সুবিধা বাস্তবে তরুণদের কাছে পৌঁছানোই বড় বিষয়। জটিল প্রক্রিয়া, দীর্ঘসূত্রতা এবং সীমিত সুযোগের কারণে অনেক উদ্যোক্তা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাই অর্থ সহায়তা সহজ, স্বচ্ছ এবং কার্যকরভাবে পৌঁছানো প্রয়োজন।
সম্প্রতি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনাও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণ কর্মীরা এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন। ঋণ পুনর্গঠন ধীর হওয়া এবং ঋণ আদায়ের চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ৭ শতাংশ সুদে ২০০ বিলিয়ন টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে। তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এই সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঋণ সংক্রান্ত ভালো রেকর্ডের শর্ত থাকায় যেসব প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে, তারাই হয়তো সহায়তা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।
এর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিও নতুন চাপ তৈরি করছে। এপ্রিল মাসে জ্বালানির দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায় এবং জুন মাসে বিদ্যুতের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলেও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটি অনেক কঠিন।
আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। ভিয়েতনাম দক্ষ মানবসম্পদ, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং সংস্কারের মাধ্যমে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর সংস্কারের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। ভারত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে লাখো মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, আর সিঙ্গাপুর দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে।
এসব উদাহরণ দেখায়, তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে শুধু শিক্ষা নয়, প্রয়োজন শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাজার সুবিধা এবং পরামর্শ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী এখনও দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু এই সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে পারে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়তে পারে। তাই এখনই শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধার সময় সীমিত। এই সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুযোগ তৈরি না হলে এই সম্ভাবনাই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

