ঢাকার সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুলের একই স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন দুই কিশোর—মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ও অমর্ত্য সেন। তখন তাঁদের কেউই হয়তো জানতেন না, ভবিষ্যতে অর্থনীতির জগতে তাঁদের পথ কতটা আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একজন পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করবেন, অন্যজন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নচর্চায় রেখে যাবেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
আনিসুর রহমানের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুল। বিভিন্ন জীবনীমূলক ও সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, এই স্কুলেই তাঁর সহপাঠী ছিলেন পরবর্তীকালের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁদের পথচলা শুরু হলেও পরবর্তী জীবনে দুজনের কর্মক্ষেত্র ও গবেষণার পরিসর আলাদা হয়ে যায়।
১৯৩৩ সালে জন্ম নেওয়া আনিসুর রহমান পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৫ সালে অর্থনীতিতে বিএ অনার্স এবং ১৯৫৬ সালে এমএ সম্পন্ন করেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ১৯৬২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জন করেন।
হার্ভার্ডে তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল উন্নয়ন অর্থনীতি ও বিনিয়োগের আঞ্চলিক বণ্টন। ১৯৬৩ সালে তাঁর ‘আঞ্চলিক বিনিয়োগ বণ্টন’ বিষয়ক একটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্থনীতি সাময়িকী ‘কোয়াটার্লি জার্নাল অব ইকোনমিক্স’-এ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়েও আঞ্চলিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে তাঁর গবেষণা অব্যাহত ছিল।
তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিশ্লেষণেও আনিসুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর গবেষণায় আঞ্চলিক সম্পদ ও বিনিয়োগের অসম বণ্টনের বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে তাঁকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন আনিসুর রহমান। বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি কাজ করেন। পরে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থায় কাজ করেন এবং ১৯৭৭ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় যোগ দেন। সেখানে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করেন। মানুষের অংশগ্রহণকে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা তাঁর চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নকে তিনি কেবল প্রবৃদ্ধি বা পরিসংখ্যানের বিষয় হিসেবে দেখেননি। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আত্মউন্নয়ন এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। অংশগ্রহণমূলক গবেষণা ও উন্নয়নচিন্তার ক্ষেত্রেও তাঁর কাজের প্রভাব রয়েছে।
অন্যদিকে সেন্ট গ্রেগরিজের সেই সহপাঠী অমর্ত্য সেন পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে তাঁর উচ্চশিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে এবং ১৯৫৯ সালে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরে ভারত ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেন। তাঁর একাডেমিক জীবনের সঙ্গে অক্সফোর্ড, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও হার্ভার্ডসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হয়।
অমর্ত্য সেনের গবেষণার পরিধিও ছিল বিস্তৃত। কল্যাণ অর্থনীতি, সামাজিক পছন্দতত্ত্ব, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, বৈষম্য ও মানুষের কল্যাণ—এসব বিষয় তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনীতির প্রচলিত আলোচনায় মানুষের বাস্তব জীবন, সুযোগ ও কল্যাণকে আরও কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল কমিটি কল্যাণ অর্থনীতিতে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে এই পুরস্কার দেয়। অর্থনীতির তাত্ত্বিক গবেষণার পাশাপাশি দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও তাঁর কাজ বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
আনিসুর রহমান ও অমর্ত্য সেনের গবেষণার ক্ষেত্র এক নয়। তাঁদের তাত্ত্বিক পদ্ধতি ও কর্মজীবনের পরিসরও ছিল আলাদা। তবে দুজনের চিন্তার মধ্যে একটি বিষয়গত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুজনের অর্থনৈতিক চিন্তাতেই মানুষের জীবন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক সুযোগ এবং উন্নয়নের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। একজন আঞ্চলিক বৈষম্য ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের দিকে জোর দিয়েছেন, অন্যজন কল্যাণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য ও সামাজিক পছন্দের মতো বিষয়কে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
তবে তাঁদের অবদানকে একই ধরনের গবেষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একই স্কুলের সহপাঠী হয়েও তাঁরা অর্থনীতির ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের স্বতন্ত্র চিন্তার জগৎ তৈরি করেছেন। অমর্ত্য সেনের গবেষণা তাঁকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ার সর্বোচ্চ স্বীকৃতির মঞ্চে। আর আনিসুর রহমানের কর্মজীবন গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বৈষম্য বিশ্লেষণ এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নচিন্তার সঙ্গে।
অর্থনীতির বাইরেও আনিসুর রহমানের ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। ২০০৪ সালে তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাঁর পরিচয়ের পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততাও তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
আনিসুর রহমান ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত বিভিন্ন স্মরণলেখায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাঁর অবদানের কথা নতুন করে উঠে আসে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের কথা স্মরণ করা হয়।
একই স্কুলের দুই সহপাঠীর জীবন তাই হয়ে উঠেছে দুটি ভিন্ন অথচ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক যাত্রার গল্প। একজন পেয়েছেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার, অন্যজন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা ও উন্নয়নচর্চায় রেখে গেছেন দীর্ঘস্থায়ী অবদান।
সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুলের সেই সময়ের দুই শিক্ষার্থীর পরবর্তী জীবনের এই পথচলা বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসেরও এক আকর্ষণীয় অধ্যায়। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠী থেকে একজন বিশ্ব অর্থনীতির নোবেলমঞ্চে, আর অন্যজন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে—দুজনের এই ভিন্ন যাত্রা দেখায়, একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাজীবন কত বিচিত্র ও সুদূরপ্রসারী পথের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

