বিশেষ বিশ্লেষণ
চট্টগ্রাম থেকে কাবুল; প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার একটানা রাস্তা, চারটি দেশ পেরিয়ে গেছে যার পথ। আজ যদি আপনি ঢাকা থেকে দিল্লি হয়ে লাহোর পর্যন্ত ট্রাক-বহরের চলাচল দেখেন, আপনি আসলে দুই হাজার বছরের পুরনো একটা ধারণার ওপর দিয়েই হাঁটছেন। এই রাস্তার নাম গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড, সংক্ষেপে জিটি রোড। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটা সাধারণ মাটির রাস্তা কীভাবে পুরো একটা উপমহাদেশের বাণিজ্য কাঠামোকেই বদলে দিতে পারে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে অর্থনীতির একেবারে মৌলিক এক নিয়মে; পরিবহন খরচ যত কমে, বাজার তত বড় হয়, আর বাজার যত বড় হয়, ব্যবসার সুযোগ তত বাড়ে। এই লেখায় আমরা দেখব, কীভাবে একটা রাস্তা কেবল যাতায়াতের মাধ্যম না থেকে বাণিজ্যের ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছিল, আর আজও কেন সেই শিক্ষা প্রাসঙ্গিক।
যে রাস্তা রাজাদের চেয়েও পুরনো
গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের গল্প শুরু হয় শের শাহ সুরির অনেক আগে থেকেই। মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর মন্ত্রী চাণক্য যে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তার প্রাণকেন্দ্র ছিল একটি সড়ক, উত্তরাপথ। এই পথ আফগানিস্তানের বলখ থেকে শুরু করে বাংলার তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস মৌর্য রাজধানী পাটলিপুত্র থেকে এই রাজপথ ধরেই ভ্রমণ করেছিলেন বলে তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্রাট অশোকের শিলালিপিতেও এই পথের ধারে ধারে বিশ্রামাগার, কূপ আর ছায়াদানকারী গাছ লাগানোর নির্দেশ পাওয়া যায় অর্থাৎ এই রাস্তা তখন থেকেই কেবল সামরিক চলাচলের জন্য নয়, বরং ব্যবসায়ী আর ভ্রমণকারীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতো। মৌর্য প্রশাসন এই পথ দিয়ে পণ্যের ওপর কর আদায় করত, গিল্ড বা বণিক সংঘগুলো এই পথ ধরেই কাপড়, মশলা আর মূল্যবান ধাতু আদান-প্রদান করত। তবে এই সময়ের রাস্তা ছিল খণ্ডিত; একটানা কোনো সুসংগঠিত সড়ক হিসেবে এটি তখনো গড়ে ওঠেনি।
পাঁচ বছরের রাজত্ব, কিন্তু পাঁচশ বছরের ভিত্তি
ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস হলো, যে মানুষটি এই রাস্তাকে প্রকৃত অর্থে একটা সংগঠিত মহাসড়কে রূপ দিলেন, তিনি ক্ষমতায় ছিলেন মাত্র পাঁচ বছর। শের শাহ সুরি, যিনি হুমায়ুনকে পরাজিত করে ১৫৪০ সালে মুঘল সিংহাসনে বসেছিলেন, বুঝেছিলেন যে বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করতে হলে দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগ অপরিহার্য। তিনি সোনারগাঁও থেকে আটক পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার ক্রোশ (আধুনিক হিসেবে যা প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটারের কাছাকাছি) এক রাস্তা নির্মাণ করান, যাকে বলা হতো সড়ক-ই-আজম। এই রাস্তার পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সরাইখানা বা বিশ্রামাগার বানানো হয়, ছায়াদানকারী গাছ লাগানো হয়, আর একটি সংগঠিত ডাক ব্যবস্থা চালু করা হয় যাতে খবর দ্রুত এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছাতে পারে। এখানেই আসল বুদ্ধিটা লুকিয়ে ছিল; শের শাহ কেবল সেনাবাহিনী চলাচলের জন্য এই রাস্তা বানাননি, তিনি জানতেন নিরাপদ ও পূর্বাভাসযোগ্য পথ থাকলে ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসবে, আর তাতে রাজস্ব বাড়বে। কৃষিপ্রধান এলাকার সঙ্গে শহুরে বাজারের সংযোগ ঘটানোর ফলে দুই প্রান্তেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়।
একটা রাস্তা কীভাবে বাজারকে বড় করে তোলে
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতির কথা বলা দরকার, যা কেবল ইতিহাসের গল্প না বরং আজকের বাণিজ্য নীতিনির্ধারণেও সমান প্রাসঙ্গিক। অ্যাডাম স্মিথ তাঁর বিখ্যাত তত্ত্বে বলেছিলেন, শ্রম বিভাজন বা স্পেশালাইজেশনের সীমা নির্ধারিত হয় বাজারের আকার দিয়ে; বাজার যত বড়, বিশেষায়িত উৎপাদনের সুযোগ তত বেশি। একটা গ্রাম যদি কেবল নিজের চাহিদা মেটানোর জন্য উৎপাদন করে, সেখানে দক্ষতা বাড়ানোর তেমন প্রণোদনা থাকে না। কিন্তু সেই গ্রাম যদি নিরাপদ রাস্তার মাধ্যমে দূরের শহরের বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সে নির্দিষ্ট একটা পণ্যে বিশেষায়িত হয়ে বেশি পরিমাণে উৎপাদন করতে পারে, আর বাকি প্রয়োজন মেটাতে পারে বাণিজ্যের মাধ্যমে। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ঠিক এই কাজটাই করেছিল; এটি বাংলার মসলিন, পাঞ্জাবের কৃষিপণ্য, আর মধ্য ভারতের হস্তশিল্পকে একটামাত্র বাজার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। পরিবহন ঝুঁকি ও খরচ কমে যাওয়ার অর্থ হলো, ব্যবসায়ীরা এখন দূরত্বের ভয় না পেয়ে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করতে পারতেন। এটাই মূলত অর্থনীতিতে যাকে বলা হয় লেনদেন খরচ বা ট্রানজ্যাকশন কস্ট কমানো; আর যেকোনো যুগে বাণিজ্য বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি এটাই।
যখন একই রাস্তা মেরামত হলো কিন্তু উদ্দেশ্য বদলে গেল
মুঘল যুগের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন উপমহাদেশে ক্ষমতা সংহত করে, তখন তারাও এই রাস্তার গুরুত্ব উপেক্ষা করতে পারেনি। তারা রাস্তাটি সংস্কার করে, প্রশস্ত করে, এবং এর নতুন নামকরণ করে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড, যে নামে আজও এটি পরিচিত। কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথ ব্রিটিশ শাসনামলে সেনা চলাচল, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আর বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো। তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষণীয়; গবেষণা বলছে, এই রাস্তা আর গঙ্গা-সিন্ধু নদীপথ বাদ দিলে উনিশ শতকের বাকি ভারতে পরিবহন খরচ ছিল অত্যন্ত বেশি, ফলে অধিকাংশ পণ্যের বাজার ছিল আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। রেলপথ চালু হওয়ার পর, বিশেষ করে ১৮৮০-এর দশক থেকে, বাণিজ্যের মূল ভার ধীরে ধীরে রাস্তা থেকে রেলে সরে যায়, কারণ রেল বাল্ক পণ্য পরিবহনে অনেক বেশি সাশ্রয়ী ছিল। এই পর্যায়ে একটা কথা স্বীকার করা জরুরি; অবকাঠামো উন্নয়ন মানেই সবার জন্য সমান সুফল নয়। ঐতিহাসিক তথ্য দেখায়, এই যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় হস্তশিল্প ব্রিটিশ কলকারখানার সস্তা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। অর্থাৎ রাস্তা বাজার বড় করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বড় বাজারে প্রতিযোগিতার শর্ত সবার জন্য সমান ছিল না।
আজও যে পথে চলছে ট্রাকের চাকা
এখন প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার পর এই রাস্তার কী হলো? মজার বিষয় হলো, এই ঐতিহাসিক রাস্তা আজও হারিয়ে যায়নি, বরং আধুনিক জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের মেরুদণ্ড হয়ে টিকে আছে। ভারতে দিল্লি থেকে অমৃতসর পর্যন্ত পুরনো এনএইচ-১ এবং দিল্লি থেকে কলকাতা পর্যন্ত পুরনো এনএইচ-২ দুটোই এই ঐতিহাসিক পথ ধরেই গড়ে উঠেছিল, যা শের শাহ সুরির নামানুসারে শেরশাহ সুরি মার্গ নামে পরিচিত ছিল। ২০১০ সালের পর ভারতের সড়ক নম্বরবিন্যাস পুনর্গঠিত হলে এই অংশগুলো একীভূত হয়ে বর্তমান এনএইচ-৪৪ ও এনএইচ-১৯-এর অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তানে এই পথের ধারাবাহিকতা এন-৫ মহাসড়ক হিসেবে লাহোর, পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ নাম বদলেছে, নম্বর বদলেছে, কিন্তু ভৌগোলিক করিডোরটা একই রয়ে গেছে। আর সেই করিডোর ধরেই আজও দক্ষিণ এশিয়ার একটা বড় অংশের পণ্য পরিবহন হয়। এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ভাবার মতো; দুই হাজার বছরের পুরনো একটা রুট পরিকল্পনা এখনো আধুনিক প্রকৌশলীদের কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, কারণ ভৌগোলিক বাস্তবতা, নদী পারাপারের সহজ স্থান, সমতল ভূমি, জনবসতির ঘনত্ব; এগুলো সহজে বদলায় না।
রাস্তা থাকলেই কি বাণিজ্য বাড়ে
এখানে একটা পর্যবেক্ষণ যোগ করা দরকার, যা আজকের নীতিনির্ধারকদের জন্যও শিক্ষণীয়। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ইতিহাস আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়; শুধু ভৌত অবকাঠামো থাকলেই বাণিজ্য বাড়ে না, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নীতিগত পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি তত্ত্ব অনুযায়ী, লেনদেনের খরচ কেবল দূরত্বের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে আইনি নিরাপত্তা, শুল্ক নীতি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপরও। আজ চট্টগ্রাম থেকে কাবুল পর্যন্ত ভৌগোলিকভাবে একটানা রাস্তা থাকলেও, এই পথ ধরে অবাধ বাণিজ্য হয় না, কারণ মাঝে রয়েছে একাধিক সীমান্ত, ভিসা জটিলতা, শুল্ক প্রাচীর আর রাজনৈতিক দূরত্ব। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে সরাসরি সড়কপথে বাণিজ্য আজও সেই সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে, যা কেবল এই একটা রাস্তার ভৌগোলিক সংযোগ থেকেই আশা করা যেত। এটাই বোধহয় গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। রাস্তা বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এর অংশ, কিন্তু শুধু এটাই যথেষ্ট না। বাকি কাজটা করতে হয় নীতি, বিশ্বাস আর প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দিয়ে; যা শের শাহ সুরি তাঁর সময়ে সরাইখানা, নিরাপত্তা আর ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন, আর আজকের রাষ্ট্রগুলোকে সেটা করতে হবে চুক্তি, শুল্ক সমন্বয় আর আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে।
দুই হাজার বছর ধরে একটা রাস্তা টিকে থাকার পেছনের কারণটা আসলে খুব সহজ; ভূগোল সহজে বদলায় না, কিন্তু মানুষ কীভাবে সেই ভূগোলকে ব্যবহার করবে, সেই সিদ্ধান্তটাই বদলে দেয় গোটা একটা অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কোনো একবারের ঘটনা নয়, বরং এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, যার সুফল পেতে কখনো কখনো শতাব্দী পেরিয়ে যায়। আজ যখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আঞ্চলিক সংযোগ আর করিডোর অর্থনীতির কথা বলে, তখন এই পুরনো রাস্তার গল্পটা আসলে একটা প্রশ্নই তুলে ধরে, আমরা কি সেই একই ভুল থেকে শিখছি, নাকি একই পথে হেঁটেও একই গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছি?
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

