ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এখনো সবচেয়ে কম দামের পণ্য সরবরাহকারী দেশগুলোর একটি। তবে কম দাম বাংলাদেশের জন্য যেমন প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করেছে, তেমনি এটি দেশের পোশাক খাতের একটি বড় সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে এখনো উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের অংশ তুলনামূলক কম।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাদের কাছে পোশাক সরবরাহকারী বড় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পণ্যের গড় মূল্য দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। শুধু পাকিস্তানের পোশাকের দাম বাংলাদেশের চেয়ে কম। অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক রপ্তানি করছে।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতি কেজির গড় রপ্তানি মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩.৮০ ইউরো। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে এই মূল্য ছিল ১৫.০৭ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাকের গড় মূল্য কমেছে ৮.৪৭ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাকের গড় মূল্য বেড়ে হয়েছে ২৯ ইউরো প্রতি কেজি। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে দেশটির পোশাকের গড় মূল্য ছিল ২৫.৯৫ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরে ভিয়েতনামের পোশাকের মূল্য বেড়েছে ১১.৭৬ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের পোশাক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও এখনো প্রধানত কম দামের সাধারণ পোশাকের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভিয়েতনাম তুলনামূলক বেশি মূল্যমানের পোশাক, বিশেষ নকশার পণ্য এবং উন্নত মানের পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে বেশি দাম পাচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ভিয়েতনাম ইউরোপে উচ্চমূল্যের পোশাক বেশি পাঠায়, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত সাধারণ মানের পোশাককেন্দ্রিক। কম দামের পোশাকে পরিমাণ বেশি হলেও এর মূল্য তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে উচ্চমূল্যের পোশাকের পরিমাণ কম হলেও প্রতিটি পণ্যের দাম অনেক বেশি হয়।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ থেকে একটি টি-শার্ট যদি ২ ডলারে বিক্রি হয়, একই ধরনের টি-শার্ট ভিয়েতনাম থেকে ৪ ডলারের বেশি দামে বিক্রি হতে পারে। এর মূল কারণ হলো পণ্যের মান, নকশা, ব্র্যান্ড মূল্য এবং উৎপাদনের বৈচিত্র্য।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বড় পরিমাণ উৎপাদন, কম উৎপাদন খরচ এবং দক্ষ শ্রমশক্তির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তবে বর্তমানে বিশ্ববাজারে শুধু কম দামের প্রতিযোগিতা যথেষ্ট নয়। ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, উন্নত নকশা, বিশেষ ধরনের পোশাক এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও পোশাকের দাম কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। রপ্তানিকারকদের মধ্যে অতিরিক্ত মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম দামে পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছে।
অন্যদিকে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক বিক্রি করেও বাজারে অবস্থান শক্ত করছে। যেমন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে কম্বোডিয়ার পোশাকের গড় মূল্য ৭.৮৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৮.৬৭ ইউরো প্রতি কেজি। তুরস্কের পোশাকের মূল্য বেড়ে হয়েছে ২৮.৩১ ইউরো, যা আগের বছরের ২৭.৮৮ ইউরোর চেয়ে বেশি।
চীনের পোশাকের গড় মূল্য একই সময়ে ২.১৮ শতাংশ কমেছে। ভারতের পোশাকের মূল্য কমেছে ১.৭৬ শতাংশ। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে মূল্য কমেছে সবচেয়ে বেশি, ১৪.৭৪ শতাংশ, ফলে দেশটির পোশাকের গড় মূল্য নেমে এসেছে ১০.৭৭ ইউরো প্রতি কেজিতে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক পোশাক আমদানির বাজারেও ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে কিছুটা সংকোচন দেখা গেছে। এই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানি মূল্য ৫.১০ শতাংশ কমে হয়েছে ৫৪.৩৮ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৩.২৩ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৮৮.৬৬ মিলিয়ন কেজিতে।
সব উৎস মিলিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক আমদানির গড় মূল্য কমেছে ১.৯৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে যেখানে প্রতি কেজির গড় মূল্য ছিল ২০.২৩ ইউরো, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে হয়েছে ১৯.৮৪ ইউরো।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য ১৩.৬৫ শতাংশ কমে হয়েছে ১০.৩৭ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৫.৬৬ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৭৫১.৯১ মিলিয়ন কেজিতে।
এর ফলে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্ব কমেছে। অর্থাৎ শুধু ইউরোপের সামগ্রিক বাজার সংকোচনের কারণে নয়, বাংলাদেশের রপ্তানিতেও আলাদা চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু বেশি পরিমাণ পণ্য উৎপাদনের ওপর নয়, বরং বেশি মূল্যমানের পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, নতুন নকশার পোশাক উৎপাদন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ কম দামের সরবরাহকারী থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো উৎপাদনের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা। তবে আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু পরিমাণ নয়, পণ্যের মূল্যমান বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

