দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার অন্যতম বড় সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে জাপান। অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্দর, নগর পরিবহনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে জাপানের সহজ শর্তের ঋণ বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ঋণের সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে জাপানের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে আপাতত বিরতিতে গেছে বাংলাদেশ।
সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার কয়েক বছরের মধ্যে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে এই ঋণের সুদের হার ৩ দশমিক ০৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী অক্টোবর থেকে এই হার আরও বেড়ে ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
একসময় জাপানের ঋণ বাংলাদেশের জন্য ছিল সবচেয়ে কম খরচের বৈদেশিক অর্থায়নের অন্যতম উৎস। কয়েক বছর আগেও জাপানি ঋণের সুদের হার ছিল ১ শতাংশের নিচে। বিশেষ করে ২০২২ সালেও জাপানের সরকারি উন্নয়ন সহায়তার ঋণ অত্যন্ত সহজ শর্তে পাওয়া যেত। ফলে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছিল।
কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জাপানও তাদের ঋণের শর্ত পুনর্বিবেচনা করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থের ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং জাপানের নিজস্ব আর্থিক নীতির পরিবর্তনের কারণে ঋণের সুদ বাড়ানো হয়েছে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাপানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সুদের হার পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং জাপানের সরকারি উন্নয়ন ঋণ গ্রহণকারী সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সুদের হার কমানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু জাপান সেই অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য জাপানের ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। এর আগে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানি ঋণের সুদের হার ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে ঋণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তুলনামূলক সুবিধাজনক ঋণের জায়গায়। একসময় স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এমন সুবিধা বজায় ছিল। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে এখন সেই সুবিধা অনেকটাই কমে এসেছে।
জাপানি ঋণের সঙ্গে আরও একটি অতিরিক্ত খরচ যুক্ত রয়েছে। প্রায় সব ঋণের ক্ষেত্রেই জাপান ০ দশমিক ০২ শতাংশ প্রাথমিক ফি গ্রহণ করে। এছাড়া এসব ঋণ সাধারণত ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়, যার মধ্যে প্রথম ১০ বছর থাকে ঋণ পরিশোধের ছাড়কাল।
সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ এখন নতুন করে জাপানের সঙ্গে কোনো ঋণ চুক্তিতে যাচ্ছে না। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, এপ্রিল মাসে নতুন সুদের হার কার্যকর হওয়ার পর থেকে জাপানের সঙ্গে নতুন কোনো ঋণ প্যাকেজ চূড়ান্ত করা হয়নি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৩ শতাংশের বেশি সুদের হারে জাপানের ঋণ এখন আগের মতো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নেই। কারণ বর্তমানে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, চীন এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকেও তুলনামূলকভাবে বিভিন্ন ধরনের অর্থায়নের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের জন্য প্রায় ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদ পরিশোধ করছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। চীনের ঋণের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ২ শতাংশ এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণে ২ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।
তবে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু ঋণের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জাপান বাংলাদেশকে প্রায় ৩৩ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের সরকারি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। ২০১২ সাল থেকে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
বর্তমানে ঢাকা মেট্রোরেল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বড় কয়েকটি প্রকল্পে জাপানের আগের অনুমোদিত অর্থায়ন চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পে নতুন সুদের চাপ সরাসরি পড়ছে না, কারণ এগুলোর অর্থায়ন আগেই নির্ধারিত হয়েছিল। তবে নতুন প্রকল্প এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কম খরচের অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করা। কারণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত সুদের বোঝা ভবিষ্যতে সরকারের বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
জাপানের ঋণের সুদ বৃদ্ধি মূলত বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতিফলন হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। দীর্ঘদিনের সহজ শর্তের অর্থায়নের যুগ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রকল্প নির্বাচন, ঋণের শর্ত এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় আরও সতর্ক সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশকে।

