দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী সিটিগ্রুপ বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ব্যাংকিং খাতে। এই পরিস্থিতিতে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে সিটিগ্রুপের জন্য দ্রুত সমাধান পরিকল্পনা তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি মাসের মধ্যেই ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল বা অন্যান্য সমাধানমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সিটিগ্রুপের ঋণ শ্রেণিকরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যাংকারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এ বিষয়ে নির্দেশনা দেন। বৈঠকে ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। এসব ব্যাংকই সিটিগ্রুপের ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সিটিগ্রুপ বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে দেশের ৩৬টি ব্যাংকের ঋণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সিটিগ্রুপের ঋণ যদি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে একসঙ্গে অনেক ব্যাংকের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিতের সুযোগ আর বাড়ছে না
সিটিগ্রুপ এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাদের ঋণ শ্রেণিকরণ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, আর্থিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই সময় প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের অনুরোধ বিবেচনা করে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। তবে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই সুবিধার মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।
ব্যাংকগুলো এক বা দুই মাস অতিরিক্ত সময় চাইলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অনুরোধ গ্রহণ করেনি। বরং চলতি মাসের মধ্যেই ঋণ সমাধানের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি হলো, দীর্ঘদিন ঋণ শ্রেণিকরণ পিছিয়ে রাখলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হবে না। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত সমাধানে যেতে হবে।
রমজানের আগে নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
সিটিগ্রুপ শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠানটি চিনি, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, ছোলা, ডালসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ভূমিকা রাখে।
রমজান মাসে এসব পণ্যের চাহিদা সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। তাই সিটিগ্রুপের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে গভর্নর বলেছেন, সিটিগ্রুপ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের কার্যক্রম সচল রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে রমজানের আগে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হোক, তা চায় না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কার্যকরী মূলধনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা
ব্যাংকারদের মতে, সিটিগ্রুপের উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে নতুন করে কার্যকরী মূলধন প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানটির কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন চালিয়ে যেতে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে বর্তমান আর্থিক চাপের মধ্যে নতুন করে অর্থায়ন করলেও প্রতিষ্ঠানটি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, যদি ব্যাংকগুলো নতুন করে কার্যকরী মূলধন দেয়, তাহলে সেটি কীভাবে ফেরত আসবে এবং বর্তমান তারল্য সংকটের মধ্যে সুদ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা থাকবে, তা বড় প্রশ্ন।
এ কারণে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন বা আগাম অর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়বে চাপ
ব্যাংকারদের আরেকটি উদ্বেগ হলো, সিটিগ্রুপের ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের অর্থ সংরক্ষণ করতে হবে।
ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিরাপত্তা হিসেবে আলাদা রাখতে হয়। এর ফলে ব্যাংকের লাভের ওপর চাপ পড়ে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সিটিগ্রুপের ঋণ খেলাপি হলে প্রতিবছরের অর্জিত মুনাফার বড় অংশ সংরক্ষণ করতে হতে পারে। তাই ব্যাংকগুলো পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজছে।
বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক
তবে ব্যাংকগুলো যদি সিটিগ্রুপকে সহায়তার বিষয়ে একমত হতে না পারে, তাহলে বিকল্প পরিকল্পনাও তৈরি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রয়োজনে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হতে পারে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সেনা কল্যাণ সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানকে কাঁচামাল আমদানির দায়িত্ব দেওয়া এবং পরে নির্ধারিত ফি নিয়ে সিটিগ্রুপের উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে।
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল লক্ষ্য হলো, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে যায় এবং বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।
ব্যাংকগুলোও সমাধানে আগ্রহী
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশরুর আরেফিন জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থ বিবেচনায় বেশির ভাগ ব্যাংকই সিটিগ্রুপকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
তিনি বলেন, রমজানের আগে নিত্যপণ্যের বাড়তি চাহিদা এবং বাজারে প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের অবস্থান ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, সিটি ব্যাংক সিটিগ্রুপকে সহায়তা করতে প্রস্তুত, যাতে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি, উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ চালিয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও জানান, সিটিগ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোকে নিজেদের পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ
সিটিগ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের ব্যাংিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও বাজার সরবরাহ সচল রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের ঋণ সংকট সমাধানে শুধু নতুন অর্থায়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন হবে স্বচ্ছ আর্থিক পরিকল্পনা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ পরিশোধের বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করা।
সিটিগ্রুপের ক্ষেত্রে আগামী কয়েক সপ্তাহ গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো সময়মতো সমাধান পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে কি না এবং সেই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থান।

