সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন অবশেষে জারি হয়েছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন কাঠামোয় বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ পাবেন। এই অর্থ গত ৩০ জুন আহরিত বা প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে, যার ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়া বেতনও পাবেন। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হলেও মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে, প্রথম ধাপে বর্তমান হারে, দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জুলাই থেকে শতভাগ কার্যকর হবে।
নতুন বেতন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়ছে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে, যা প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৯.০৭৬ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১:১.৭৮। এছাড়া প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পাবেন, যা আগে শুধু ৫ম গ্রেডের জন্য প্রযোজ্য ছিল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা চালু হচ্ছে, যা একটি ঐতিহাসিক সংযোজন। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশনধারীদের ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকার কেন পুরো বেতন একবারে দিচ্ছে না, তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে। এর পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ একবারে ব্যয় করলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। এ কারণেই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে অর্থনীতি ধাক্কা সামলে নিতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদ ড. মাশরুর রেজ সতর্ক করে বলেছেন, প্রথম ধাপটি সংযত রাখা উচিত এবং বড় অংশ পরের দুই থেকে তিন বছরে বাস্তবায়ন করা উচিত, যখন মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসবে।
নতুন কাঠামোয় অন্যান্য সব ভাতা এবং পেনশন সুবিধা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন স্ল্যাব অনুযায়ী বাড়ানো হয়েছে। যারা মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশন পান, তারা ১০০ শতাংশ বাড়তি পাবেন। ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীরা ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকার বেশি পেনশনধারীরা ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি পেনশন পাবেন। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
২০১৫ সালের পর এটি প্রথম বেতন কাঠামো, অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ১২ বছর পর নতুন স্কেল পেতে যাচ্ছেন। ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশন গত ২১ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়, যা সুপারিশ চূড়ান্ত করে। গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয় এবং অবশেষে ১৯ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এখন দেখার বিষয়, প্রজ্ঞাপন জারির পর কত দ্রুত বেতন ফিক্সেশন সম্পন্ন হয় এবং কর্মচারীরা কত দ্রুত বর্ধিত বেতন হাতে পান।

