ভারতের সঙ্গে আগের সরকারের সময়ে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই এসব চুক্তির সুবিধা, দায় ও কার্যকারিতা যাচাই করা হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৮ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমের খবর তারা দেখেছে, তবে তখন পর্যন্ত ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—১০১টি চুক্তিকে শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা কঠিন। কারণ সব চুক্তির প্রকৃতি এক নয়। কোনোটি বাণিজ্য নিয়ে, কোনোটি বিদ্যুৎ কেনা নিয়ে, কোনোটি যোগাযোগ ও পরিবহন নিয়ে, আবার কোনোটি পানি, সীমান্ত বা অন্য ধরনের সহযোগিতা নিয়ে হতে পারে। সমঝোতা স্মারক ও পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক চুক্তির আইনি গুরুত্বও সব ক্ষেত্রে সমান নয়।
তাই পর্যালোচনার মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রতিটি ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কী দিয়েছে, কী পেয়েছে, কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তা দেশের অর্থনৈতিক, কৌশলগত বা নিরাপত্তা স্বার্থে কতটা কার্যকর।
বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলসীমান্ত চুক্তির ইতিহাস এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের সংশ্লিষ্ট প্রটোকল কার্যকর করার জন্য ২০১৫ সালে দুই দেশ অনুমোদনের দলিল বিনিময় করে। পরে ৩১ জুলাই ২০১৫ মধ্যরাত থেকে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে কয়েক দশকের নাগরিকত্ব ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে।
সে সময় বিরোধী রাজনীতিতে থাকা খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও ছিটমহল বিনিময়কে স্বাগত জানিয়েছিল। ১ আগস্ট ২০১৫ দলটি নতুন নাগরিকদের অভিনন্দন জানায় এবং তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।
এই ঘটনাটি দেখায়, কোনো চুক্তি কোন সরকারের সময়ে হয়েছে—শুধু সেটি দিয়ে তার কার্যকারিতা নির্ধারণ করা যায় না। আবার কোনো চুক্তি একবার স্বাক্ষরিত হয়েছে বলেই সেটি ভবিষ্যতে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে, এমনও নয়। পরিস্থিতি বদলালে বাণিজ্যিক বা নীতিগত শর্ত পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সমুদ্রসীমা নির্ধারণেও একই ধরনের রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার উদাহরণ রয়েছে। ৭ জুলাই ২০১৪ আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ ও ভারতের বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে। বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার পায়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের একটি আইনি নিষ্পত্তি হয়।
অন্যদিকে জ্বালানি খাতের কিছু চুক্তি তুলনামূলক ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২০১৭ সালে চুক্তি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওই বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ গড়ে প্রতি ইউনিটে ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা পরিশোধ করেছে, যেখানে অন্যান্য ভারতীয় সরবরাহকারীর বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ৯ টাকা ৫৭ পয়সা। চুক্তির ব্যয় নির্ধারণ ও কর-সুবিধার হিসাব নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিরোধও তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের চুক্তির পর্যালোচনায় রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে হিসাব, চুক্তির ধারা এবং বিকল্প সরবরাহকারীর মূল্য তুলনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুতের দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, বাংলাদেশের আর্থিক দায় কত, কর-সুবিধার সুবিধাভোগী কে এবং চুক্তি সংশোধনের আইনি সুযোগ আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে প্রকৃত লাভ-ক্ষতি বোঝা সহজ হয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একমুখী নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগ বাড়লে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের সুবিধা পেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও পরিবহন, বন্দর, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা থেকে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের এক গবেষণায় অনুমান করা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নির্বিঘ্ন পরিবহন যোগাযোগ গড়ে উঠলে বাংলাদেশের জাতীয় আয় সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ এবং ভারতের ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে এটি বাস্তবে অর্জিত ফল নয়; পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি মডেলভিত্তিক হিসাব।
ফলে যোগাযোগ চুক্তি মূল্যায়নের সময় শুধু প্রতিবেশী দেশ কতটা লাভ করছে তা দেখলে পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ কত রাজস্ব পাচ্ছে, দেশীয় ব্যবসা ও বন্দর কতটা উপকৃত হচ্ছে, অবকাঠামোর ওপর কী চাপ পড়ছে এবং বিনিময়ে কী সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে—এসব বিষয়ও একসঙ্গে পরিমাপ করা প্রয়োজন।
পানি বণ্টনের প্রশ্ন সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর। যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চুক্তি অনুযায়ী পানি বণ্টনের কার্যক্রম চলছে এবং বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে।
তাই গঙ্গার পানি নিয়ে আলোচনা এখন শুধু পুরোনো চুক্তি পর্যালোচনার বিষয় নয়, সামনে নতুন ব্যবস্থা কী হবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্য শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রয়োজন, নদীর প্রবাহ, কৃষি, পরিবেশ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রভাবের মতো বিষয়গুলো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আলোচনায় তোলা প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার কার্যকারিতা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সিদ্ধান্ত সামনে আসে তার ওপর। শুধু কতটি চুক্তি আগের সরকারের সময়ে হয়েছিল, সেই হিসাবের চেয়ে প্রতিটি চুক্তির বাস্তব ফলাফল আলাদাভাবে দেখা বেশি তথ্যবহুল।
কোনো ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ব্যয় বেশি কিন্তু সুবিধা কম হলে সংশোধন বা পুনরায় আলোচনার যুক্তি সামনে আসতে পারে। কোনো চুক্তি সময়ের সঙ্গে অকার্যকর হয়ে গেলে সেটিও পুনর্বিবেচনার বিষয় হতে পারে। আবার যেসব ব্যবস্থা বাস্তবে দেশের অর্থনীতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ বা অন্য রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কার্যকর হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও সেই ফলাফল স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ভৌগোলিক বাস্তবতা, নদী, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মূল্যায়নে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি তথ্য, আর্থিক হিসাব, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিষয়গুলো আলাদাভাবে যাচাই করাই পর্যালোচনার প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ করবে।

