বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে পরিচিত মার্কিন ডলার গত প্রায় আট দশক ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক লেনদেনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের একক আধিপত্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস জোট আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ জোরদার করছে। ফলে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে কি ডলারের প্রভাব কমে যাচ্ছে? ডলারের জায়গা কি অন্য কোনো মুদ্রা নিতে যাচ্ছে?
তবে বাস্তবতা হলো, এটি ডলারের পতনের গল্প নয়। বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, যেখানে একাধিক মুদ্রা, বিকল্প অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক আর্থিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ব্রিকস এখন আর ইউরোর মতো একটি একক নতুন মুদ্রা চালুর পথে এগোচ্ছে না। বরং তারা এমন একটি বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যার মাধ্যমে দেশগুলো ডলারের মধ্যস্থতা ছাড়াই নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, অর্থ পরিশোধ এবং ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বড় শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রবাসী আয় এবং ডিজিটাল অর্থ ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি যুক্ত।
ডলারের আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন কেন উঠছে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন ডলার। বর্তমানে বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশ ডলারে রাখা হয়। যদিও এই হার কয়েক দশক আগের তুলনায় কমেছে, তবুও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য মূল্য নির্ধারণ, ঋণ গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থায় ডলারের অবস্থান এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী।
ডলারের এই প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষমতা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা, ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং ডলারভিত্তিক আর্থিক কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাবের অন্যতম উৎস।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং দেশটির বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে দেয়।
এই ঘটনা অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে আসে। তারা বুঝতে পারে, ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কখনো কখনো রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এর পর থেকেই ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ আরও জোরালো করে।
ব্রিকস কি নতুন মুদ্রা তৈরি করছে?
ব্রিকসের নতুন মুদ্রা চালুর বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে জোটটি এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বরং ব্রিকস বর্তমানে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, এমন অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা তৈরি করা, যা প্রচলিত ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে। তৃতীয়ত, স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়ার পরিমাণ বাড়ানো।
এর অর্থ হলো, ব্রিকস ডলারকে একদিনে সরিয়ে দিতে চাইছে না। তারা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে আন্তর্জাতিক লেনদেনে দেশগুলোর কাছে আরও বেশি বিকল্প থাকবে।
এই পরিবর্তনকে অনেক বিশ্লেষক আর্থিক বিপ্লবের চেয়ে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
ডলারের জায়গা নেওয়া এত কঠিন কেন?
কোনো একটি মুদ্রাকে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার জায়গা নিতে হলে শুধু রাজনৈতিক সমর্থন যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিশাল আর্থিক বাজার, অবাধ লেনদেনের সুযোগ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং নিরাপদ সম্পদের পর্যাপ্ত সরবরাহ।
চীনের ইউয়ান আন্তর্জাতিক ব্যবহারে বাড়লেও এখনো অনেক সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। চীনের আর্থিক বাজারে প্রবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং ইউয়ানের অবাধ ব্যবহার এখনো ডলারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
অন্যদিকে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামোও এক নয়। তাদের মূল্যস্ফীতি, মুদ্রানীতি, বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং আর্থিক বাজারে বড় পার্থক্য রয়েছে।
তাই একটি অভিন্ন মুদ্রা তৈরি করা বাস্তবে খুব কঠিন।
ডলারের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আইনি কাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আস্থা।
ভারতের অবস্থান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ব্রিকসের মধ্যে ভারত একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। দেশটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রুপির ব্যবহার বাড়াতে চাইলেও পুরোপুরি ডলারবিরোধী অবস্থান নিতে চায় না।
ভারতের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও তার বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।
তাই ভারতের কৌশল হলো, যেখানে সুবিধা পাওয়া যায় সেখানে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো, কিন্তু বৈশ্বিক ডলার ব্যবস্থার সুবিধা থেকেও দূরে না সরে যাওয়া।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের বাস্তব সমস্যা
নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের ধারণা আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এর কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে তেল বাণিজ্যের ঘটনা এর একটি উদাহরণ। রাশিয়া ভারতের কাছে তেল বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ রুপি আয় করেছিল। কিন্তু পরে সেই রুপি ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ দুই দেশের বাণিজ্যের ভারসাম্য সমান ছিল না।
এতে বোঝা যায়, শুধু ডলার বাদ দিলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সমস্যা সমাধান হয় না। একটি কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী বাজার, সহজ লেনদেন ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য সম্পদ।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?
বিশ্ব অর্থনীতিতে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক ঋণ এবং জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত কয়েক বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মধ্যে পড়েছে এবং টাকার মূল্য ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়েছে।
তবে বিকল্প অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য কিছু সুযোগ তৈরি করতে পারে।
চীন ও ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো গেলে কিছু ক্ষেত্রে লেনদেন খরচ কমতে পারে। একইভাবে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ সুবিধা পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় প্রবাসী আয় গ্রহণকারী দেশ। উন্নত ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা তৈরি হলে প্রবাসী আয় পাঠানোর খরচ কমতে পারে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের জন্য ডলারকে বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় অংশ এখনো ডলার বা ইউরোতে নির্ধারিত হয়। বৈদেশিক রিজার্ভ, জ্বালানি আমদানি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়নও মূলত ডলারনির্ভর।
তাই বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত বিকল্প তৈরি করা, কিন্তু আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট না করা।
তাহলে কি ডলারের যুগ শেষ হচ্ছে?
বর্তমান তথ্য বলছে, ডলারের পতন এখনো বাস্তবতা নয়। তবে ডলারের একক আধিপত্য ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
ব্রিকস ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে এমন একটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে দেশগুলোর কাছে একাধিক বিকল্প থাকবে।
এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটবে না। এটি ধীরে ধীরে বিভিন্ন মুদ্রা, অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক আর্থিক কেন্দ্রের বিকাশের মাধ্যমে ঘটতে পারে।
ডলার আগামী বহু বছর বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে থাকতে পারে, কারণ এর মতো বড় আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো অন্য কোনো মুদ্রার নেই।
তবে বিশ্ব এখন আর একটি মাত্র আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। ব্রিকসের উদ্যোগ সেই পরিবর্তনেরই একটি অংশ।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনকে আতঙ্ক বা অতিরিক্ত আশাবাদ দিয়ে না দেখে বাস্তবভাবে প্রস্তুতি নেওয়া। বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, বাণিজ্যের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা, ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ উন্নত করা এবং কোনো একক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।
ব্রিকস হয়তো ডলারকে সরিয়ে দেবে না, কিন্তু এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে অর্থের চলাচলের নিয়ম বদলে দিতে পারে। আর এই ধীর পরিবর্তনই ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক রূপান্তরগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

