বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন কেন্দ্র হিসেবে একসময় বড় স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল পায়রা বন্দরকে ঘিরে। দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা এই বন্দরকে শুধু জাহাজ নোঙরের স্থান হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন, জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং নতুন লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে উন্নয়ন কার্যক্রম চলার পর বন্দরটি এখনো নিষ্ক্রিয় রয়ে গেছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পায়রা বন্দরের জন্য কি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা রয়েছে, নাকি অবকাঠামো নির্মাণই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে?
গত ১৩ বছরে পায়রা বন্দরের উন্নয়নে প্রায় ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু বিপুল বিনিয়োগের তুলনায় বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনো সীমিত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পায়রা বন্দরে আসা প্রায় ২ হাজার ৯৬২টি জাহাজের মধ্যে মাত্র ২৯টি ছিল বিদেশি জাহাজ। একই সময়ে বন্দরটি প্রায় ৫৫ লাখ টন আমদানি পণ্য পরিচালনা করেছে, যার বড় অংশই ছিল নিকটবর্তী পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনা কয়লা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ সময়ে কোনো রপ্তানি পণ্য পরিচালিত হয়নি এবং প্রায় ৯৯ শতাংশ পণ্য দেশীয় জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে- পায়রা কি সত্যিকার অর্থে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বন্দরে পরিণত হচ্ছে, নাকি এটি এখনো নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পের সহায়ক অবকাঠামো হিসেবেই সীমাবদ্ধ? কারণ একটি বন্দর শুধু জেটি, সড়ক, টার্মিনাল বা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সফল হয় না। একটি কার্যকর বন্দরের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত কার্গো প্রবাহ, প্রতিযোগিতামূলক পরিচালন ব্যয়, শিল্পভিত্তিক চাহিদা, দক্ষ কাস্টমস ব্যবস্থা, পরিবহন সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশল।
পায়রা বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি দেখায়, অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে সমান্তরালে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি হয়নি। কোন ধরনের পণ্য নিয়মিতভাবে এখানে আসবে, কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান পায়রাকে ব্যবহার করবে, কোন শিপিং কোম্পানি কেন এই বন্দরকে বেছে নেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে রাজস্ব আয় তৈরি হবে- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
একটি বন্দরের মূল শক্তি হলো তার পণ্য প্রবাহ। বর্তমানে পায়রার প্রধান কার্গো উৎস হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানি। এটি বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখতে সাহায্য করলেও একটি বহুমুখী আন্তর্জাতিক বন্দরের জন্য একটি মাত্র পণ্যের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। একটি সফল বন্দরের জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন ধরনের আমদানি-রপ্তানি পণ্য, শিল্পভিত্তিক চাহিদা এবং নিয়মিত জাহাজ চলাচল।
পায়রা বন্দরের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী। ২০১৫ সালের সরকারি পরিকল্পনায় এটিকে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বড় জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক পণ্য স্থানান্তর এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পায়রাকে গড়ে তোলার চিন্তা ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে বাস্তবতার কারণে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। ২০২১ সালে সরকার গভীর সমুদ্রবন্দরের ধারণা থেকে সরে এসে সাধারণ সমুদ্রবন্দর হিসেবে পায়রার উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যায়।
এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গভীর সমুদ্রবন্দর ও সাধারণ সমুদ্রবন্দরের ব্যবসায়িক কাঠামো এক নয়। বড় জাহাজ, বিপুল কার্গো এবং আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর নির্ভরশীল একটি বন্দরের জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন, ছোট ও মাঝারি জাহাজভিত্তিক বন্দরের জন্য তা কার্যকর নাও হতে পারে। তাই পায়রার ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পায়রা বন্দরের সবচেয়ে বড় ভৌত সীমাবদ্ধতা হলো এর প্রবেশপথ রাবনাবাদ চ্যানেল। এই চ্যানেলটি অত্যন্ত পলিপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত, যেখানে নিয়মিত পলি জমে নাব্যতা কমে যায়। এখানে সমস্যাটি শুধু ড্রেজিংয়ের নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য গভীরতা ধরে রাখার খরচের বিষয়।
বড় আকারের ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে একসময় প্রায় ১০.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ চলাচলের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এর জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হয় এবং প্রায় ৫২৪ মিলিয়ন ইউরোর অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, এই নাব্যতা ধরে রাখা কঠিন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চ্যানেলের গভীরতা কমে গেলে বড় জাহাজ চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়। ফলে কয়লার কিছু চালান চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস করে ছোট জাহাজের মাধ্যমে পায়রায় আনার প্রয়োজন হয়, যা অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করে।
তাই পায়রার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় শুধু এই প্রশ্ন করা যথেষ্ট নয় যে, বন্দরকে কত গভীর করা যাবে। বরং মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- এই গভীরতা কত বছর ধরে রাখা যাবে, এর বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কত হবে এবং সেই ব্যয় বহন করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবসা তৈরি হবে কি না।
সরকারের এখন একটি স্বচ্ছ বাণিজ্যিক ও নৌচলাচল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যেখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
প্রথমত, রাবনাবাদ চ্যানেলের টেকসই গভীরতা নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ কত গভীরতা তৈরি করা সম্ভব, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কত গভীরতা দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবসম্মতভাবে ধরে রাখা যাবে। (কারণ, পায়রা সমুদ্রবন্দরের প্রধান নৌপথ ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের টেকসই নাব্যতা নির্ধারণ এবং তা বজায় রাখা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ৬,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ২০২৪ সালের এপ্রিলে চ্যানেলটির গভীরতা ১০.৫ মিটারে উন্নীত করা হলেও, এটি অত্যন্ত পলিপ্রবণ (Silt-heavy zone) হওয়ায় দ্রুত গভীরতা হারাচ্ছে।)
দ্বিতীয়ত, বার্ষিক ড্রেজিং খরচ ও তার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রতি বছর নৌপথ সচল রাখতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, তা বন্দরের সম্ভাব্য আয় দিয়ে কতটা পূরণ করা সম্ভব- এই হিসাব পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, বাস্তবসম্মত পণ্য পরিবহনের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে। আগামী ৫, ১০ ও ১৫ বছরে পায়রা দিয়ে কী ধরনের পণ্য আসবে, কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করবে এবং কত পরিমাণ কার্গো তৈরি হবে- তার একটি নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন।
চতুর্থত, রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা নির্ধারণ করতে হবে। বন্দরের পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও ড্রেজিং ব্যয়ের তুলনায় কত আয় সম্ভব হবে, তা স্পষ্ট না হলে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন।
এর পাশাপাশি আরও দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো শিল্প ও লজিস্টিকস সংযোগ। কারণ কোনো বন্দর একা সফল হয় না; এর সঙ্গে শিল্পাঞ্চল, সড়ক, রেল, নৌপথ এবং গুদাম ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। পটুয়াখালী ইপিজেড ভবিষ্যতে পায়রার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্গো উৎস হতে পারে, তবে তার জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বাস্তবে এখানে যুক্ত করতে হবে।
অন্যটি হলো কাস্টমস ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। একটি আন্তর্জাতিক বন্দরের জন্য শুধু জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা যথেষ্ট নয়। দ্রুত পণ্য খালাস, স্ক্যানিং, পরীক্ষা, ডিজিটাল সেবা এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা সময় ও খরচ বিবেচনা করে বন্দর নির্বাচন করেন।
পায়রাকে আরেকটি চট্টগ্রাম বন্দরে পরিণত করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। বরং এর ভৌগোলিক অবস্থান, নদীপথ সংযোগ এবং বিদ্যমান সক্ষমতার ভিত্তিতে একটি বিশেষায়িত ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করা যেতে পারে।
পায়রা প্রথমত একটি জ্বালানি ও বাল্ক কার্গো হাব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কয়লার পাশাপাশি সার, খাদ্যশস্য, খনিজ পণ্যসহ অন্যান্য বাল্ক পণ্য পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এটি দক্ষিণাঞ্চলীয় শিল্প লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পায়রার মাধ্যমে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তৃতীয়ত, পায়রা উপকূলীয় ও ফিডার শিপিং হাব হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহার করে ছোট জাহাজ ও বার্জ পরিবহনের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
চতুর্থত, প্রকল্প কার্গো ও বিশেষায়িত পণ্য পরিবহন পায়রার জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। বড় শিল্প প্রকল্পের যন্ত্রপাতি, ভারী সরঞ্জাম এবং বিশেষ ধরনের পণ্য পরিবহনে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য আগে নির্ধারণ করতে হবে- পায়রা আসলে কোন ধরনের বন্দরে পরিণত হতে চায়। একটি পরিষ্কার ব্যবসায়িক পরিচয় ছাড়া নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ভবিষ্যতে আরও ব্যয় বাড়াতে পারে। তাই প্রয়োজন পায়রার জন্য নতুন বাণিজ্যিক কাঠামো।
পায়রা বন্দর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও নৌপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন আবেগনির্ভর নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা।
১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নতুন জেটি বা আরও ড্রেজিং নয়; বরং পায়রা কোন ধরনের বন্দরে পরিণত হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হবে।
টেকসই নাব্যতা, নিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং ব্যয়, বাস্তবসম্মত কার্গো পরিকল্পনা, রাজস্ব আয়, শিল্প সংযোগ এবং দক্ষ পরিচালন ব্যবস্থা- এই বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করেই পায়রার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।
সঠিক বাণিজ্যিক কাঠামো তৈরি করা হলে পায়রা দক্ষিণাঞ্চলের নতুন অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হতে পারে। কিন্তু যদি অবকাঠামো নির্মাণ ব্যবসায়িক পরিকল্পনার আগে চলে, তাহলে বিপুল বিনিয়োগের পরও এটি সীমিত ব্যবহারের একটি বন্দরে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করবে।

