দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্য কার্যকর হলো এ সপ্তাহে। রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায়। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই বৃদ্ধি নজিরবিহীন—গত মে মাসেও ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ ও পেট্রোল ১৪০ টাকা, যা সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল।
কেন এই সিদ্ধান্ত উদ্বেগজনক
পরিবহন খাতে প্রভাব সরাসরি ও তাৎক্ষণিক। ভাড়া বৃদ্ধির হাত ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কৃষি খাতেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে, কারণ সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে—এমন সময়ে, যখন বাজার ব্যবস্থার নানা ত্রুটির কারণে কৃষক এমনিতেই ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত।
সরকারি যুক্তি বনাম প্রকৃত হিসাব
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসানের কথা বলে এই মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। তবে সমকালের একটি সম্পাদকীয়তে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির নিজস্ব হিসাবই বলছে ভিন্ন কথা: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব খরচ ও কর বাদ দিয়েও বিপিসি প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা প্রকৃত মুনাফা করেছে। গত ১১ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি দামে তেল বিক্রি করে সংস্থাটির সঞ্চিত মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকায়, আর এই সময়ে কর-শুল্ক ও ঋণ পরিশোধ বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকার বেশি। একই সূত্র অনুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে ১৪ টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে—যে দাবি বিপিসির নিজস্ব লাভের পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ক্ষমতা গ্রহণের সময় অন্তত দুই বছর গ্যাস-তেল-বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পাঁচ মাসের মধ্যে এটি তৃতীয়বারের মতো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।
বিকল্প পথ ছিল কি?
বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় বিপিসি যতটা ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা জ্বালানির ওপর আরোপিত প্রায় ৩২ শতাংশ কর-শুল্কের একাংশ কমিয়েই পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল। অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প কাটছাঁট এবং প্রশাসনিক অপচয় রোধ করেও ভর্তুকির অর্থ জোগাড় করা যেত। জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে ভর্তুকিকে ব্যয় না ভেবে জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইতিমধ্যে ব্যয় সংকোচনের চাপে থাকা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর এই সিদ্ধান্তের বোঝা কতটা যৌক্তিক ও সময়োপযোগী—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

