গত এক বছরে হঠাৎ কোনো বড় খরচ এলে টাকাটা আপনি কোথা থেকে জোগাড় করতেন? বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষকেরা ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৬১ শতাংশের চিকিৎসার খরচ মেটাতে ধার করতে, সম্পদ বেচতে কিংবা আত্মীয়স্বজনের সাহায্য নিতে হয়েছে। খরচের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে জমানো টাকা থেকে, তবে সেটি মাত্র ৩২.৬ শতাংশ। ধার করে ২৬.৮ শতাংশ, আত্মীয় ও বন্ধুদের কাছ থেকে ১৮.৭ শতাংশ, আর সম্পদ বিক্রি করে ১৫.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে টাকা জোগাড় হয়েছে। নিয়মিত আয় থেকে মিটেছে মাত্র ৬.৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদেরা এই ধরনের চাপের মুখে নেওয়া অর্থসংস্থানকে বলেন ডিসট্রেস ফাইন্যান্সিং, অর্থাৎ বিপদের ঋণ। জরুরি তহবিলকে আমরা অনেক সময় গোছানো মানুষের শখ ভাবি, অথচ তার অভাবেই একটি পরিবার বিপদের প্রথম দিনেই ঋণের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
ডায়রিয়ার বিলও যখন ঋণের গল্প হয়ে ওঠে
আপনি ভাবতে পারেন, এই ঋণের ভিড় কেবল ক্যানসার বা হৃদরোগের মতো বড় রোগের ব্যাপার। কিন্তু তথ্য অন্য কথা বলে। গবেষণায় হাসপাতালে ভর্তির বছরপ্রতি গড় নিজ পকেটের খরচ ধরা হয়েছে ৪১৮ ডলার। গবেষণায় ব্যবহৃত ২০২২ সালের বিনিময় হার (ডলারপ্রতি ৯৪.৭ টাকা) ধরলে তা প্রায় ৩৯ হাজার ৬০০ টাকা। সরকারি হাসপাতালে গড় খরচ ছিল প্রায় ২৬ হাজার ৮০০ টাকা, বেসরকারিতে প্রায় ৫১ হাজার টাকা। এবার সাধারণ রোগের দিকে তাকান। ডায়রিয়ায় ভর্তির গড় খরচ ছিল ১১১ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার ৫০০ টাকা। তবু এই রোগীদের প্রায় ৪৪ শতাংশের পরিবারকে বিপদের ঋণ, সম্পদ বিক্রি বা সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ভর্তির সবচেয়ে বড় কারণ ছিল গর্ভকালীন জটিলতা, ১৭.২৩ শতাংশ। এতে গড় খরচ প্রায় ২৪ হাজার ২০০ টাকা এবং অর্ধেকের বেশি, ৫১.৭৩ শতাংশ পরিবারকে বিপদের ঋণের পথে যেতে হয়েছে। এখান থেকে আমার প্রথম পর্যবেক্ষণ হলো, ঋণে ফেলার জন্য বিপদকে বড় হতে হয় না, হাতের সঞ্চয়ের চেয়ে বড় হলেই যথেষ্ট। ঋণে যাওয়ার আসল মাপকাঠি বিপদের আকার নয়, বিপদ আর জমানো টাকার মধ্যকার ফারাক। তবে সীমাবদ্ধতাও জানিয়ে রাখা দরকার। এটি কেবল হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য, ২০২২ সালের দামে। গবেষকেরা নিজেরাই বলেছেন, যাঁরা টাকার অভাবে চিকিৎসাই নিতে পারেননি, তাঁরা এই হিসাবের বাইরে থেকে গেছেন, ফলে প্রকৃত চাপ আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
সুদের হিসাবটা যেখানে চুপচাপ কাজ করে
এবার একটি সরল অঙ্ক কষা যাক, যা পূর্বাভাস নয়, শুধু ব্যাপারটা বোঝার সহজ উদাহরণ। ধরুন ৪০ হাজার টাকার খরচ মেটাতে আপনি বছরে ২৫ শতাংশ সুদে ধার নিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ সুদের সীমা ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, তাই এটি বাস্তবসম্মত একটি ঊর্ধ্বসীমা। কিস্তি না দিলে বছর বছর সুদ আসলের সঙ্গে যোগ হয় (চক্রবৃদ্ধি সুদ)। তখন ঋণ এক বছরে দাঁড়ায় ৫০ হাজার, দুই বছরে ৬২ হাজার ৫০০ আর তিন বছরে ৭৮ হাজার ১২৫ টাকায়। মানে প্রায় তিন বছরে দ্বিগুণ। বাস্তবে কেউ কিস্তি না দিয়ে বসে থাকে না, কিন্তু কিস্তির টাকাটা আসে আগামী মাসের আয় থেকে, আর সেই আয়ের ওপর আগামী মাসের চালডালের দাবি আগেই বসানো থাকে। ফলে পরের ছোট ধাক্কাটা এলে আবার নতুন ধার লাগে, আর তখনই ঋণের ওপর ঋণ জমতে শুরু করে। এখানে সময়ের একটা অদ্ভুত অসমতা আছে। প্রতি মাসে এক হাজার টাকা জমালে ৪০ হাজার টাকা হতে লাগে ৪০ মাস, প্রায় সাড়ে তিন বছর। অথচ ঋণে সেই একই সময় আপনার বিপক্ষে কাজ করে। সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সময় আপনার শ্রম চায়, ঋণের ক্ষেত্রে সময় আপনার কাছে সুদ চায়। এর ওপর আছে মূল্যস্ফীতির চাপ। বিবিএসের হিসাবে ২০২৬ সালের আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে ৯.৩২ শতাংশ। সংসারের হাতে যা বাড়তি থাকে, তা আরও সরু হয়ে আসছে।
অভাব যখন চিন্তার পথ সরু করে দেয়
প্রশ্ন উঠতে পারে, সুদের হার এত বেশি জেনেও মানুষ ধার নেয় কেন? এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন আচরণগত অর্থনীতির গবেষকেরা। ২০১২ সালে ‘সায়েন্স’ জার্নালে আনুজ শাহ, সেন্ধিল মুল্লাইনাথান ও এলদার শাফির একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন পরীক্ষায় তাঁরা দেখান, অভাব মানুষের মনোযোগকে সামনের জরুরি চাহিদার দিকে টেনে নেয়, আর বাকি সবকিছু তখন আড়ালে চলে যায়। পরিণতি হিসেবে মানুষ ঋণের সুবিধাটা দেখে, খরচটা নয়। পরীক্ষাগারের খেলায় অভাবে পড়া অংশগ্রহণকারীরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ধার নিয়েছেন। মুল্লাইনাথান ও শাফির বইয়ে এই অবস্থাকে বলা হয়েছে টানেলিং, অর্থাৎ সুড়ঙ্গে ঢুকে যাওয়ার মতো দৃষ্টি। এর অর্থ, বিপদের মুহূর্তে কম হিসাব করে ধার নেওয়া নির্বুদ্ধিতা নয়, অভাবেরই চরিত্র। অর্থনীতির পুরোনো তত্ত্বও একই দিকে ইঙ্গিত করে। ১৯৩৬ সালে কেইনস তাঁর ‘জেনারেল থিওরি’ তে সঞ্চয়ের আটটি উদ্দেশ্যের প্রথমটিই রেখেছিলেন অপ্রত্যাশিত ঘটনার বিরুদ্ধে একটি রিজার্ভ গড়ে তোলা। ক্রিস্টোফার ক্যারলের বাফার স্টক তত্ত্ব আরও এগিয়ে বলে, আয়ের অনিশ্চয়তা থাকলে পরিবার সাধারণত আয়ের তুলনায় একটি নির্দিষ্ট মজুত ধরে রাখতে চায়। মানে, জরুরি তহবিল কোনো নতুন উপদেশ নয়, এটি অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে অর্থনীতির সবচেয়ে পুরোনো যুক্তিগুলোর একটি।
এটা কি শুধুই আপনার দোষ?
এখানে থেমে সব দায় ব্যক্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী দেশের কর্মজীবী মানুষের ৮৪.৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, অর্থাৎ বাঁধা বেতন, ছুটি বা কোনো নিরাপত্তা জালের নিশ্চয়তা তাঁদের নেই। স্বাস্থ্যখাতে খরচের ভার সবচেয়ে বেশি পড়ে সরাসরি পরিবারের ঘাড়ে। জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব অনুযায়ী মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৮.৫ শতাংশ ছিল নিজ পকেট থেকে, ২০২০ সালে। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৭৩ শতাংশে ঠেকেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরেই সর্বোচ্চ। ওই বছর মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় ছিল ৫৮ ডলার। বিআইডিএসের গবেষণা অনুযায়ী মাত্র এক শতাংশেরও কম মানুষ কোনো স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আছেন। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী বাংলাদেশে পুরুষদের ৫০ শতাংশ বলেছেন জরুরি অবস্থায় টাকা জোগাড়ের নির্ভরযোগ্য উৎস তাঁদের আছে, নারীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ২৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের ফিনডেক্স বলছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে মাত্র ৫৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক জরুরি টাকা জোগাড় করতে পারেন। এটা কেবল গরিব দেশের সমস্যাও নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সমীক্ষায় ২০২৫ সালে ৬৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন, ৪০০ ডলারের আকস্মিক খরচ তাঁরা নগদ বা সমমানের উৎস থেকে মেটাতে পারবেন। ১৮ শতাংশ বলেছেন, শুধু সঞ্চয় থেকে তাঁরা ১০০ ডলারের কম খরচই সামলাতে পারেন। দুই সমীক্ষার প্রশ্ন আলাদা, তাই সংখ্যাগুলো সরাসরি তুলনা করা যায় না। আমার মূল কথা হলো, ব্যক্তির সঞ্চয়ের দায় যেমন আছে, ব্যবস্থার দায়ও আছে, এবং একটি অন্যটির বিকল্প হতে পারে না। স্বাস্থ্যবিমা আর নিরাপত্তা জাল দুর্বল থাকলে জরুরি তহবিলের ওপর চাপ বাড়ে, আবার যাঁর জরুরি তহবিল আছে, তিনি ব্যবস্থার ফাঁকটুকু নিজেই কিছুটা ভরাট করে নিতে পারেন।
মুষ্টি চালের হিসাব থেকে কী শেখা যায়
তাহলে শুরুটা কোথায়? এর একটা সূত্র পাওয়া যায় আমাদের গ্রামের পুরোনো চর্চায়। ‘পোর্টফোলিওজ অব দ্য পুওর’ বইয়ের লেখকেরা ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় আড়াইশো পরিবারের আর্থিক লেনদেনের ডায়েরি অনুসরণ করেছিলেন। তাঁরা লিখেছেন, গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রায় সব পরিবারই মুষ্টি চালের ঐতিহ্য মেনে চলত, অর্থাৎ প্রতিবার রান্নার সময় এক মুঠো চাল আলাদা করে রাখত অভাবের দিনের জন্য। এই ছোট অভ্যাসের ভেতরেই জরুরি তহবিলের পুরো দর্শন আছে: বিপদ আসার আগে, অল্প অল্প করে, নিয়মিত। এখান থেকে আমার ব্যক্তিগত মত হলো, শুরুতে ছয় মাসের খরচের মতো বড় লক্ষ্য না ধরে একটি সাধারণ বিপদের দাম দিয়ে লক্ষ্য ঠিক করা বাস্তবসম্মত। গবেষণার হিসাবে সেটি সরকারি হাসপাতালে প্রায় ২৬ হাজার ৮০০ টাকা, গড়ে প্রায় ৩৯ হাজার ৬০০ টাকা। মাসে এক হাজার টাকা জমালে ৪০ মাস, দুই হাজার টাকা জমালে ২০ মাসে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। জমানো টাকা দৈনন্দিন খরচের হিসাব থেকে আলাদা রাখলে সেই টানেলিংয়ের ঝুঁকিও কমে, কারণ সামনের চাপে হাত দেওয়ার প্রলোভন কমে যায়। মাঝপথে বিপদ এসে গেলে যা জমেছে সেটুকুই ঋণের অঙ্ক ছোট করে দেবে। সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ছোট অঙ্কও একেবারে শূন্যের চেয়ে অনেক ভালো।
বিপদ কবে আসবে, কেউ জানে না। জানা আছে শুধু এটুকু যে, এলে সেদিনই টাকার দরকার পড়বে, আর আয় তখন নিজের গতিতেই চলবে। এই ফাঁকটুকু ভরাট করার জন্য হয় ঋণ, নয়তো জরুরি তহবিল। জরুরি তহবিল আসলে নিজের কাছ থেকেই সুদহীন ধার নেওয়ার ব্যবস্থা, শুধু টাকাটা জমাতে হয় বিপদ আসার আগে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

