দেশের অন্যতম অর্থকরী কৃষিপণ্য পান রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের আইনি ও কাঠামোগত বাধা আপাতত দূর হয়েছে। এতদিন বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির প্রত্যয়নপত্র ছাড়া বিদেশে পান পাঠানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক সম্প্রতি এক আদেশের মাধ্যমে এই বাধ্যবাধকতা স্থগিত করেছেন। এর ফলে সাধারণ ও স্বাধীন রপ্তানিকারকদের জন্য এখন আর সমিতির মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকতে হবে না। আইনি এই সুরাহার ফলে পানের আন্তর্জাতিক বাজার দেশের সব রপ্তানিকারকের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হলো যা সার্বিক রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
বাণিজ্যের পথে বাধা ও সিন্ডিকেটের শঙ্কা
বাণিজ্য ও অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে কোনো একটি নির্দিষ্ট সমিতির প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক করা হলে সেখানে একচেটিয়া আধিপত্য বা সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার প্রবল শঙ্কা থাকে। পান একটি অত্যন্ত পচনশীল কৃষিপণ্য হওয়ায় এটি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদেশে পাঠাতে হয়। রপ্তানিকারকদের যদি প্রতিটি চালানের জন্য নির্দিষ্ট একটি সমিতির ছাড়পত্রের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় তবে একদিকে যেমন অহেতুক সময়ক্ষেপণ হয় অন্যদিকে বাড়ে ব্যবসার পরিচালন ব্যয়। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন এ ধরনের বাধ্যবাধকতা মুক্তবাজার অর্থনীতির পরিপন্থি। এটি সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করে এবং গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে পুরো খাতের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়। আপিল বিভাগের নতুন আদেশের ফলে সেই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের শঙ্কা কেটে গেল এবং বাজারে একটি সুস্থ ও অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরে এল।
এই আইনি জটিলতার সূত্রপাত হয়েছিল গত ৬ আগস্ট। ওই দিন বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির করা একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ একটি আদেশ জারি করে। ৫৪১৯/২০২৬ নম্বরের ওই রিট পিটিশনের রায়ে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির নির্দিষ্ট প্রত্যয়নপত্র ছাড়া বাংলাদেশ থেকে কোনোভাবেই পান রপ্তানি করা যাবে না। আদালতের ওই রায়ের পর পরই পান রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ায় সমিতির ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি তদারকি ছাড়া বেসরকারি একটি সমিতির এমন নিয়ন্ত্রণ কৃষি বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের উদ্যোগ ও আইনি লড়াই
হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সেটি অনুধাবন করে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ওই আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে একটি আবেদন দায়ের করেন। সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপিল নম্বর ৩৬৫৯ অব ২০২৬ এর শুনানিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং তাকে সহায়তা করেন মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. তাজুল ইসলাম। অন্যদিকে পান রপ্তানিকারক সমিতির পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল ও অ্যাডভোকেট ফয়সাল মোহাম্মদ ফায়োজী। উভয় পক্ষের যুক্তি ও আইনি দিক পর্যালোচনার পর চেম্বার বিচারপতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আবেদন মঞ্জুর করেন এবং হাইকোর্টের আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে দেন।
বাংলাদেশ থেকে মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রচুর পরিমাণে পান রপ্তানি হয় এবং এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করেন কেবল একটি নির্দিষ্ট সমিতির মাধ্যমে রপ্তানি নিয়ন্ত্রিত হলে প্রান্তিক পানচাষিরা তাদের পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমে যায়। এখন যেহেতু সেই আইনি বাধা আপাতত স্থগিত রয়েছে তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য প্রযোজ্য রাষ্ট্রীয় সাধারণ আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে যে কেউ পান রপ্তানি করতে পারবেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পানের নতুন গন্তব্য তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক চাষি ও স্বাধীন রপ্তানিকারক উভয়েই আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। মুক্ত বাণিজ্যের এই সুযোগ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

