দেশের আবাসন খাতে দীর্ঘদিনের চাঙাভাব এখন অনেকটাই কমে এসেছে। উচ্চ সুদের হার, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ কমছে। এর প্রভাব শুধু আবাসন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং নির্মাণসামগ্রী, ব্যাংকিং, পরিবহন, কর্মসংস্থান ও ভোগ্যপণ্যের বাজারেও চাপ তৈরি করছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজধানী ঢাকায় ফ্ল্যাট বিক্রির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য ঋণের কিস্তি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাড়তে থাকা নির্মাণ খরচ মিলিয়ে নতুন ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে উঠেছে।
ফ্ল্যাট বিক্রির এই ধীরগতি আবাসন নির্মাতাদেরও সতর্ক অবস্থানে নিয়ে গেছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান আগের তুলনায় বেশি হিসাব করে এগোচ্ছে। বিক্রি কমে গেলে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের প্রবাহে সমস্যা তৈরি হয়, যা চলমান প্রকল্পের গতি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে।
আবাসন খাতের গুরুত্ব শুধু বাড়ি নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি আবাসিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, বালু, টাইলস, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং স্যানিটারি পণ্যের মতো বহু শিল্প। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ কমে গেলে এসব খাতেও চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
নির্মাণ কার্যক্রমের ধীরগতির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। রাজমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, প্রকৌশলীসহ অসংখ্য মানুষ সরাসরি আবাসন খাতের সঙ্গে যুক্ত। প্রকল্প কমে গেলে তাদের কাজের সুযোগ ও আয়ও কমে যেতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কমে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে ঋণের খরচ। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ায় ফ্ল্যাট কেনার জন্য নেওয়া গৃহঋণের মাসিক কিস্তি বেড়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার বড় ধরনের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়ছে।
ফ্ল্যাট বিক্রি কমার প্রভাব পরোক্ষভাবে আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং গৃহস্থালি সামগ্রীর বাজারেও পড়তে পারে। কারণ নতুন বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার পর সাধারণত মানুষ আসবাব, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কেনে। নতুন আবাসন প্রকল্পের গতি কমলে এসব পণ্যের চাহিদাতেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের গৃহঋণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় ও কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা, প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে আবাসনের চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বর্তমান সংকট কাটাতে হলে ক্রেতার সক্ষমতা, নির্মাতাদের বিনিয়োগ এবং আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। আবাসন খাত আবার গতি ফিরে পেলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে নির্মাণসামগ্রী শিল্প, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।

