উচ্চ ফলননির্ভর কৃষি, মাটির পুষ্টিক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চাল, গম ও সবজিতে কমতে পারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ। পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণের পরও অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ছেন বহু মানুষ।
খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও সেই খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার নিশ্চয়তা কমছে। ফসলের পুষ্টিমান হ্রাস, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্যের অভাব বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বাংলাদেশের মতো চালনির্ভর দেশেও এ পরিস্থিতি পুষ্টিনিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্যোগ প্রতিষ্ঠান ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চার্স (ডিএসভি) এবং মার্ক লিওনার্ড ট্রাস্টের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে উচ্চ ফলনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ফলে বিভিন্ন ফসলে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘনত্ব কমেছে। ‘হলো হারভেস্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে কিছু ফসলে আয়রন, জিঙ্ক ও প্রোটিনের মতো পুষ্টি উপাদান ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হ্রাস সব ফসল বা সব অঞ্চলের ক্ষেত্রে সমান নয়।
বাংলাদেশে এ উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাটির অবক্ষয়। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ২০২০ সালের ভূমি অবক্ষয়সংক্রান্ত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ ভূমি বিভিন্ন মাত্রার অবক্ষয়ের শিকার। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার, জৈব পদার্থের ঘাটতি, জমিতে ধারাবাহিক চাষাবাদ এবং সুষম সার ব্যবস্থাপনার অভাব মাটির গুণগত মানের ওপর চাপ তৈরি করছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে ফসলের উৎপাদনশীলতা ও পুষ্টিমান উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশে পুষ্টির ঘাটতির চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০১১-১২ সালের জাতীয় অণুপুষ্টি জরিপে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী গর্ভবতী নন ও স্তন্যদান করছেন না—এমন নারীদের ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে জিঙ্কের ঘাটতি ছিল। তবে এগুলো পুরোনো জরিপের তথ্য; বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হালনাগাদ জাতীয় জরিপ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যের অভাব, প্রাণিজ খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণের সীমাবদ্ধতা এবং খাদ্যের পুষ্টিমান সবই এ সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফসলের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার পেছনে উচ্চ ফলনশীল জাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, মাটির জৈব পদার্থ ও অণুজীবের ক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়লে কিছু ফসলে শর্করার অনুপাত বাড়তে পারে, অথচ প্রোটিন, আয়রন ও জিঙ্কের ঘনত্ব কমতে পারে। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের পরিবর্তনকে পুষ্টির ‘ডাইলিউশন ইফেক্ট’ বা পুষ্টির ঘনত্ব হ্রাসের প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ফলে মানুষ পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার খেলেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতিতে ভুগতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘হিডেন হাঙ্গার’ বা অদৃশ্য ক্ষুধা।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন নীতিতে শুধু ফলন বাড়ানোর পরিবর্তে ফসলের পুষ্টিমানকেও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত, যেমন ব্রি ধান৭৪ ও ব্রি ধান ১০০, খাদ্যের মাধ্যমে জিঙ্কের ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি চালের অতিরিক্ত ছাঁটাই ও পলিশিং কমানো, সুষম সার প্রয়োগ, জৈব সার ব্যবহার, ফসলের পর্যায়ক্রমিক চাষ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ স্থানীয় জাতের আবাদ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের নীতিগত সুপারিশের মূল কথা হলো, খাদ্যনিরাপত্তার সাফল্য শুধু কতটুকু খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে, তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। উৎপাদিত খাদ্যে মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃষি গবেষণা, প্রণোদনা ও সরকারি সহায়তায় পুষ্টিমানকে অগ্রাধিকার দেওয়া না হলে উৎপাদন বাড়লেও জনস্বাস্থ্যের পুষ্টিসংকট পুরোপুরি কাটানো কঠিন হতে পারে।

