বাংলাদেশের একটি খুবই সাধারণ চিত্র হল “জোর যার, মুল্লুক তার”বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও যেন সেই একই চিত্র। বড় ঋণখেলাপিরা হাজার কোটি টাকার ঋণ বকেয়া থাকলেও কোনো জবাবদিহিতা নেই অথচ সাধারণ ঋণগ্রহীতার কিস্তি পরিশোধে সামান্য ব্যর্থতাও তাদের আরও আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দেয়,দিতে হয় জরিমানা,থাকে জামানত হারানোর ভয়।সরকার বদলায় কিন্তু ঋণখেলাপিরা কোনো সময়ই সরকার এর জবাবদিহিতার আওতায় আসছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।২০০৮ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। দেড় দশকের বেশি সময়ে বেড়েছে প্রায় ২৭ গুণ।
বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে ঋণ পরিশোধ এর জন্য পুনঃতফসিল করা হয় কিন্তু তা তেও কোনো লাভ হচ্ছে না বরং ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকে, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে এবং শেষ পর্যন্ত চাপ তৈরি হয় আমানতকারী ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।পাঁচ বছরে ২০২১ সালের ২৬,৮১০ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায়—অর্থাৎ প্রায় ৬.৪ গুণ হয়েছে।এই বিপুল খেলাপি ঋণের জন্য দায়ী শুধু ঋণগ্রহীতারা নন বরং ব্যাংক এর অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।যাচাই না করে ঋণ বিতরণ করা,ঋণ দেওয়ার বিপরীতে সেই পরিমান জামানত জমা না রাখা,রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দেওয়া এইসব কারণে হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।ব্যাংকগুলো কাকে ঋণ দিচ্ছে, সেই টাকা ফেরত আসছে কি না তার বিষয়ে ঠিকমতো নজরদারি নেই।
দেওয়ানি আদালতের চিত্রও ভালো নয়। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে চার ধরনের আদালতে ২ লাখ ১৩ হাজার মামলা ঝুলে ছিল, যেখানে আটকে ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। নিষ্পত্তি হওয়া ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার মামলায় আদায় হয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, অর্থাৎ ২০.২৫ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, কোনো কোনো মামলা আট থেকে দশ বছর ঝুলে থাকে, আর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রক্রিয়াটাকে আরও লম্বা করে। এখানে ফাইন্যান্সের একটা পুরোনো নীতি কাজ করে, টাইম ভ্যালু অব মানি। আজকের এক টাকা আর দশ বছর পরের এক টাকা সমান নয়। যে টাকা আজ সরিয়ে ফেলা যায়, দশ বছর পরে রায় এলেও তা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই বিচার যত দেরিতে আসে, শাস্তি তত হালকা হয়ে যায়। আইনের পুরোনো কথাটাও এখানে খাটে, বিলম্বিত বিচার মানে বিচার না পাওয়া। তবে এর অন্য পিঠও আছে।ঋণখেলাপি গ্রুপ এস আলম এর আইনজীবীরা বলছেন, সম্পদ জব্দের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ শোধ করতে পারছে না। ঠিক কার দাবি কতটা সত্য, সেটা আদালতই বলবে, আর সেজন্যও দ্রুত বিচার দরকার।
এখানে আরেকটা বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার। পাঁচ মাসের দেওয়ানি কারাবাস সাধারণত ডিক্রির টাকা আদায়ে চাপ তৈরির আইনি উপায়, জালিয়াতির ফৌজদারি সাজা নয়। আর ফৌজদারি পথ মানে দুদক, চার্জশিট, বিচার, আপিল।এখন মামলার ঢল নেমেছে। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্টের মধ্যে ৪৬টি ব্যাংক চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে ১ হাজার ২৮টি মামলা করেছে, যেখানে দাবি ৭৩ হাজার ১০১ কোটি টাকা, আর এর ৮৬ শতাংশ এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কিত। দুদক এই গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ ৬৭ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ১০ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও সিঙ্গাপুরে পাচারের অভিযোগে সংস্থাটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মামলা করেছে। এগুলো অভিযোগ, প্রমাণিত অপরাধ নয়, তাই কোনো তাৎক্ষণিক কার্যক্রম ও নেই।আবার টাকা একবার সীমানা পেরিয়ে গেলে দেশের আদালতের নাগাল পাওয়া সহজ হয় না।
ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন,যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হস্তে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না।তবে বাস্তব চিত্র দেখলে মনে হয় খেলাপি ঋণের সমাধান হিসেবে কঠোর বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড় দেওয়ার নীতিতেই হাটছে।
পাল্টা প্রচেষ্টাও চলছে, এটা অস্বীকার করা ঠিক হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ঢেলে সাজিয়েছে এবং পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ক্ষমতা দিয়েছে, ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার করে মালিকেরা প্রতারণা করলে ব্যবস্থা নেওয়ার। এপ্রিলে পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮এ ধারায় সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছিল, মাত্র ৭.৫ শতাংশ আগাম দিয়ে। সমালোচনার মুখে ৯ সেপ্টেম্বর সংসদ সেই ধারা বাতিল করেছে, যা একটা ইতিবাচক সংশোধন। তবে লক্ষ্যের দিকে তাকালে খটকা লাগে। এপ্রিলে অর্থমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নগদে আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। এক শতাংশ! আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বলছে, খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশ এখন মন্দ বা ক্ষতিজনক মানের, মানে আদায়ের আশা ক্ষীণ।
আমার মতে সমস্যাটা তিনটি আলাদা ঘড়ির। প্রথমটা সময়ের, ঋণ আদালতে আর হাইকোর্টে মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো, যেটা ব্যাংকাররাও বহুদিন ধরে বলছেন। দ্বিতীয়টা নিশ্চয়তার, মামলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সম্পদ জব্দ আর বিদেশে সম্পদ খুঁজে বের করার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যাতে ‘ধরা পড়ার সম্ভাবনা’ বাস্তব হয়। তৃতীয়টা দায়বদ্ধতার,ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যাঁরা নেন তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সব ঋণখেলাপি লুটেরা নন, ব্যবসায় লোকসান খাওয়া মানুষও আছেন, তাই দ্রুত বিচার দুই পক্ষের জন্যই জরুরি। শেষে একটা প্রশ্ন রেখে যাই। এই বিপুল অঙ্কের দায় শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে পড়ে, আমানতকারী আর করদাতার ঘাড়ে নয় কি?
ঋণ নেয় বড় বড় প্রতিষ্ঠান কিন্তু সেই ঋণ যখন খেলাপি ঋণ হয়ে যায় তা শোধ করতে হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে থেকে যার অর্থ জোগাতে হয় জনগণের করের টাকা থেকে। সরকারের মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে বেতন, সুদ ও ভর্তুকিতে যা নন-প্রোডাক্টিভ খাত।গত অর্থবছরের জিডিপি ৪.২২ থেকে ৩.৯৭ নেমে এসেছে।তার উপর দেশের জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির ৯০ শতাংশই অল্প কয়েকজনের দখলে চলে গেছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় গভীর সংস্কার ও সুশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।অর্থাৎ,ব্যাংকের টাকা ফেরত না এলে তার প্রভাব শুধু ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এর জন্য দরকার ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা দের জবাবদিহিতা।ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করলে রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যবসায়িক প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।থাকতে হবে বড় বড় ঋণখেলাপিদের থেকে ঋণ আদায়ের স্বচ্ছতা। কেননা সেইগুলি জনগণের টাকায় এই পরিশোধ করা হয়।সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ডিজিটালাইজ করার উদ্ধোগ নিতে হবে।
কৃষিবিদ নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

