৭ অক্টোবর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮.৩৪ শতাংশ, যা আগস্টে ছিল ৮.২৬ শতাংশ। এর ছয় দিন পর আইএমএফ জানাল, চলতি ২০২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে উঠতে পারে। সেই পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০১১ অর্থবছরের পর, অর্থাৎ শেষ ১৬ বছরের মধ্যে এটাই হবে সবচেয়ে বড় গড় মূল্যস্ফীতি হার। হয়তো, সংখ্যাগুলো শুনতে তেমন একটা গুরুতর লাগছে না কিন্তু এই সংখ্যাগুলোই নিঃশব্দে খালি করছে সাধারণ মানুষের পকেট। চলুন আজ বোঝার চেস্টা করি, মূল্যস্ফীতি কিভাবে আমাদের অর্থনীতিতে গণশত্রু হিসেবে কাজ কড়ছে।
৮.৩৪ শতাংশ কি সত্যিই স্বস্তির খবর?
অনেকে বলছেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরের ৮.৩৬ শতাংশের চেয়ে তো একটু কমই আছে। কিন্তু এখানেই একটা সূক্ষ্ম ফাঁদ আছে। এক বছর আগের একই মাসের তুলনায় দাম কতটা বেড়েছে, এই হিসাবকেই বলা হয় পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি। ৮.৩৪ শতাংশ মানে এক বছর আগে যে জিনিস ১০০ টাকায় কেনা যেত, আজ তার জন্য লাগছে ১০৮ টাকা ৩৪ পয়সা। অর্থাৎ দাম এখনও বাড়ছে, শুধু বাড়ার গতিটা কিছুটা কম। অর্থনীতিতে একটা পরিচিত বাস্তবতা আছে: দাম যত দ্রুত ওঠে, তত দ্রুত নামে না। মূল্যস্ফীতির হার হলো গাড়ির গতি, আর দামের স্তর হলো এ পর্যন্ত পাড়ি দেওয়া দূরত্ব। গতি একটু কমলেও দূরত্ব তো আর পেছনে ফেরে না। বিবিএসের একজন কর্মকর্তাও আগস্টের হার প্রসঙ্গে প্রায় একই কথা বলেছেন, বার্ষিক হার কমা মানে পণ্যের দাম কমা নয়।
চার বছরে ১০০ টাকার কী হাল হলো?
এবার একটা হিসাব করে দেখা যাক, যেটা সাধারণত খবরে আসে না। বিবিএসের হিসাবে ২০২৩ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০২ শতাংশ, ২০২৪ অর্থবছরে ৯.৭৩ শতাংশ, ২০২৫ অর্থবছরে ১০.০৩ শতাংশ এবং ২০২৬ অর্থবছরে ৮.৭ শতাংশ। এর মাঝে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এক মাসের হার ১১.৬৬ শতাংশে উঠেছিল, যা প্রায় এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। বার্ষিক গড় হারগুলো পরপর গুণ করলে দেখা যায়, ২০২২ অর্থবছরের গড় দামের তুলনায় ২০২৬ অর্থবছরের গড় দাম বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। সহজ করে বললে, চার বছর আগের ১০০ টাকা দিয়ে তখন যা কেনা যেত, এখন তার সমান জিনিস কিনতে লাগে মোটামুটি ৭০ টাকা। এটা সরকারি সূচকের গড় বাস্তবতা। যে পরিবারের খরচের বড় অংশ খাবার, ভাড়া আর ওষুধে যায়, তাদের নিজস্ব হিসাব এর চেয়ে ভিন্ন হতে পারে, তবে দিকটা একই।
বেতনের খামে আসলে কী ঘটছে?
বেতনের ব্যাপারটা লক্ষ্য করলে ব্যাপারটা আরও ভাবনার হয়। বিবিএসের মজুরি সূচক অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে দেশের মজুরি বেড়েছে ৭.৯০ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.৪৪ শতাংশ পয়েন্ট কম। এই সূচক কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩ ধরনের কম আয়ের পেশার মজুরি ধরে হিসাব করা হয়। একটানা ৫৬ মাস ধরে মজুরির প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির নিচে আছে। তত্ত্বের কথা বললে, আসল আয় বা রিয়েল ইনকাম বোঝার সহজ নিয়ম হলো, আয় যত শতাংশ বাড়ল তা থেকে দাম যত শতাংশ বাড়ল তা বাদ দিন। ফল যদি ঋণাত্মক হয় আপনি কাগজে বেশি টাকা আয় করলেও, আসলে আপনি দিন দিন আপনার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একেক মাসের ফাঁক ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু সেটা ৫৬ মাস ধরে একই দিকে জমেছে। সাবেক বিশ্বব্যাংক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সতর্ক করেছেন, মূল্যস্ফীতি বাড়ার সময় নামমাত্র মজুরির প্রবৃদ্ধিও কমছে। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে।
কম আয়ের পরিবার কীভাবে সামলাচ্ছে?
উনিশ শতকের জার্মান পরিসংখ্যানবিদ আর্নস্ট এঙ্গেল দেখিয়েছিলেন, আয় কমলে মোট ব্যয়ের বড় অংশ যায় খাবারে। তাই সব দাম একই হারে বাড়লেও গরিব পরিবারের ওপর তার ধাক্কা পড়ে বেশি। সানেমের একটি জরিপ (২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর, ৯ হাজার ৬৫টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে) সেই বিষয়টি অনুধাবন করেছিলো। ৭০ শতাংশ পরিবার বাধ্য হয়ে খাওয়ার ধরন বদলেছে, ৩৫ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত খরচ কমিয়েছে, ২৮ শতাংশ ধার করেছে আর ১৭ শতাংশ জমানো টাকা ভেঙেছে। গরিব পরিবারের মধ্যে মাঝারি মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ২৫ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশ হয়েছিল। জরিপটি পুরোনো, তবে প্রবণতা বোঝার জন্য কাজের। এখনকার পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির দিকও আছে। সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.২২ শতাংশ, যা গত বছরের ৭.৬৪ শতাংশের চেয়ে কম। কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশ, গত বছর ছিল ৮.৯৮। বিশ্বব্যাংক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই খাতের প্রায় সব উপখাতেই দাম বেড়েছে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাও এর বাইরে নয়, আর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুতে। পেট চালানোর খরচ একটু থামলেও ঘর চালানোর খরচ থামছে না।
সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে কত মানুষ?
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট বলছে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে ২২.৫ শতাংশ হয়েছে। শুধু এক অর্থবছরেই নতুন করে দরিদ্র হয়েছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ, আর চার বছরে সংখ্যাটা প্রায় ৮০ লাখ। প্রতিদিন ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখার নিচে থাকা মানুষের হার ১.১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০.১ শতাংশ। আরও উদ্বেগের তথ্য হলো, দারিদ্র্যরেখার ঠিক ওপরে থাকা প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ একটা ধাক্কা খেলেই নিচে পড়ে যেতে পারেন। একটা কথা পরিষ্কার রাখা দরকার। বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য বাড়ার কারণ হিসেবে শুধু মূল্যস্ফীতিকে দেখায়নি। দীর্ঘ মন্দা আর দুর্বল কর্মসংস্থানও এর সঙ্গে আছে। প্রবৃদ্ধি ২০২৬ অর্থবছরে ৩.৪ শতাংশ, যা গত এক দশকের গড় ৫.৬ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। আইএমএফ আগামী অর্থবছরের জন্য ৩.২ শতাংশ বলছে। আয় বাড়ছে ধীরে, দাম বাড়ছে দ্রুত, এই জোড়া চাপের অর্থনৈতিক নাম স্ট্যাগফ্লেশন। বাংলাদেশ পুরোপুরি সেখানে পৌঁছেছে কি না তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু লক্ষণগুলো সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।
সুদের হার কমানো কি একটু তাড়াহুড়ো ছিল?
জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবার নীতি সুদহার বা পলিসি রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ করেছে। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বর জ্বালানির দাম বেড়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাবও আসছে, তাই ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাংক হার আর না কমিয়ে আরও এক দুই মাস পরিস্থিতি দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থনীতির একটা সহজ সূত্র আছে: আসল সুদহার হলো নামমাত্র সুদহার থেকে মূল্যস্ফীতির বিয়োগফল। সেই হিসাবে ৯.৫ থেকে ৮.৩৪ বাদ দিলে আসল সুদহার থাকে ১ শতাংশের কিছু বেশি, অর্থাৎ নীতিগত অবস্থান যতটা কড়া শোনায়, ততটা নয়। বিশ্বব্যাংক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন তাই সতর্ক হতে বলেছেন, কারণ মাসওয়ারি প্রবণতা এভাবে চললে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে ঢোকার ঝুঁকি আছে। অন্যদিকে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান মনে করেন, মূল্যস্ফীতি কমতে থাকলে ধাপে ধাপে হার কমানো যেতে পারে। তবে এখানে একটা সীমাবদ্ধতাও মনে রাখা দরকার। সুদের হার চাহিদা সামলাতে পারে, কিন্তু গ্যাস, বিদ্যুৎ আর আমদানি করা জ্বালানির দাম কমাতে পারে না। মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ২০২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্বব্যাংক বলছে ৮.৬ শতাংশ, এডিবি বলছে ৯ শতাংশ আর আইএমএফ বলছে ১০.৯ শতাংশ, আর সরকারের লক্ষ্য ৭.৫ শতাংশ। অর্থাৎ সবচেয়ে আশাবাদী পূর্বাভাসও লক্ষ্যের চেয়ে ওপরে।
ভর্তুকির টাকা আসলে কার পকেটে যায়?
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশ জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ, (অর্থাৎ বছরে প্রায় ১ হাজার ৭৪০ কোটি ডলার) খরচ করে জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি আর সামাজিক সুরক্ষায়। অথচ সবচেয়ে গরিব পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই, আর বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেকই চলে যাচ্ছে শহরের সবচেয়ে ধনী অংশের হাতে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি আরও কার্যকর করা, খাদ্য ভর্তুকি একত্র করা আর ফ্যামিলি কার্ড ঠিকমতো চালানো গেলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তোলা সম্ভব। উল্টো দিকের ঝুঁকিটাও ওই প্রতিবেদনেই আছে: ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ছাড়া বিদ্যুতের ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে নিলে দারিদ্র্যের হার ২.৮ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে। অর্থাৎ ভর্তুকি নিয়ে সমাধান কেবল কমানো বা বাড়ানো নয়, ঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানো। তাই লড়াইটা দুটো। একটা হলো দাম কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, আরেকটা হলো দাম যতদিন চড়া থাকবে, ততদিন সবচেয়ে দুর্বল পরিবারগুলোকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। সামনে নজর রাখার মতো দুটো জিনিস আছে: অক্টোবরের মূল্যস্ফীতির পরের তথ্য আর পলিসি রেট নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী সিদ্ধান্ত। কারণ সংখ্যার ওপরে গিয়ে প্রশ্ন একটাই, যাদের আয় সবচেয়ে কম, তাদের পকেট বাঁচাবে কে?
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

